Sunday, August 30, 2020

এক ঘর, দশ উঠোন

দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

ওপরে উঠতে চাইছি। চাঁদ ঘোলাটে হয়ে গেল মধ্যরাতে। 

সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে কৈশোর দেখছি। এখন রাত।

যত ওপরের দিকে যাই...

ততই কান্না পায়। ততই অন্ধকার।


একলা হতে হতে ক্রমশ মনে পড়ে যাচ্ছে

একান্নবর্তী হাঁড়িশুদ্ধ ভাত কবেই আলাদা হয়ে গেছে 

সে এক বর্ষার দিনে। সে এক কাগজে কলমে।


কেঁদে কেঁদে খুঁজে চলেছি এক উঠোন। 

খুঁজে চলেছি...খুঁজে চলেছি...রঙিন জামা,

হাফপ্যান্টের পকেট। পকেটের ভেতর শুধুই অন্ধকার।


আমি আলাদা হয়ে যাচ্ছি। অন্তর্ঘাতে সবকিছু থেকে আলাদা।

Tuesday, August 11, 2020

আমার সইকথা



দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

"অটোগ্রাফ" শব্দটি কীভাবে জেনেছিলাম আজ আর বলতে পারবো না। হয়তো স্কুল পেরোচ্ছি যখন। তখন আর কতই বয়স। সতেরো অথবা সদ্য নাগরিকের স্বীকৃতি পেতে চলেছি তেমন বয়স। কীভাবে অটোগ্রাফ হয়, কারা দেন, কারা দিতে পারেন সেই সম্বন্ধে কোনো ধারণাই তো ছিলো না সেইসময়। একটু একটু মনে পড়ছে বুক থেকে স্বেচ্ছাসেবকের ব্যাজ খুলে এক যাত্রাশিল্পীর সই নিয়েছিল আমার মামার ছেলে। সেও আমাকে বলেছিল অটোগ্রাফ। তারপর বুঝতে শিখলাম অটোগ্রাফ কী। অটোগ্রাফের খাতাই বা কী। 

২০০৮ সালের ১৭ নভেম্বর (যদি ভুল না বলে থাকি) নন্দনে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের শেষ দিন। আমি উদভ্রান্তের মতো হাতে একটি ডায়েরি নিয়ে ঘুরছি। ঘুরছি অটোগ্রাফের আশায়। গ্রাম থেকে হঠাৎ এবং দ্বিতীয়বার মহানগরে যাওয়া আমি মৃণাল সেনের অটোগ্রাফ চাইতে পিছনে পিছনে গেলাম। উনি একটিও কথা না বলে রাজকীয় মেজাজে ভেতরে ঢুকে গেলেন প্রেক্ষাগৃহের বাদামি দরজার ওপারে। তক্ষুনি আমার ডান কাঁধটা ঝাঁকিয়ে একজন ঘুরিয়ে ওর দিকে আমাকে করে নিল। বলল, "জানো না, উনি অটোগ্রাফ দেন না!" সেই প্রথম কারো কাছে অটোগ্রাফ চাইতে গিয়ে বুঝেছিলাম এটি কী পরিমান পরম বস্তু। 

সরে এলাম যথেষ্ট অবাক হয়ে। কাঁচা মনে ভয়ও ধরেছিল বৈকি! ভেতরে প্রদর্শিত হবে রবীন্দ্রনাথের 'চতুরঙ্গ'। সিনেমার পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায় আমার সামনে দাঁড়িয়ে। পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেন দামিনী চরিত্রের ঋতুপর্ণা। এলেন কবীর সুমন। সেদিনের সন্ধ্যায় দেখেছিলাম রূপোলি পর্দার অনেক সোনালী মানুষ-মানুষীদের। আমার পরিশ্রম বিফলে যায় নি। একে একে অনেকেরই অটোগ্রাফ নিয়েছিলাম সেই হেমন্ত সন্ধ্যায়। হঠাৎ চারিদিকে সাইরেনের আওয়াজ। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রেক্ষাগৃহের দিকে এগিয়ে আসছেন। আমি উদগ্রীব। ওনারও অটোগ্রাফ চাই। পুলিশ আমাকে আটকালো। পিছনে অনেক লোক। আমি ছটফট করছিলাম। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থমকে দাঁড়ালেন। বললেন, "ওদের আসতে দাও।" আমি ও আমরা হুড়মুড়িয়ে ওনার পিছন পিছন প্রেক্ষাগৃহের বাদামি দরজা পর্যন্ত গেলাম। ধবধবে মানুষটি আলো অন্ধকারের ভেতরে ঢুকে গেলেন। আমি অটোগ্রাফ নেবার কথা ভুলেই গিয়েছি তখন।

কলেজবেলা থেকেই একটু বড়ো হচ্ছি ক্রমে ক্রমে। কতদিন বিভিন্নভাবে নিজের সই করে খাতার পিছন ভরিয়েছি। যদি কেউ আমারও অটোগ্রাফ নেয়! যদি কখনো আমিও দেবার যোগ্যতা পাই। যোগ্যতম হয়ে উঠতে পারি। সেই ভেবে কত দিন, কত কাল শুধু খাতার পিছন ভরিয়ে ভরিয়ে গোপনে নিজেকে প্রশ্রয় দিয়ে গেছি। পালন করতে পারিনি। বুঝেছি, প্রশ্রয় দেওয়া আর পালন করা এক জিনিস নয়। আজও অটোগ্রাফ দেওয়ার যোগ্যতমের কাছাকাছি অবস্থানও আমার একজীবনে কখনোই সম্ভব নয়। তাই সময়ের সান্নিধ্যে সেইসব খাতার দেওয়ালে ধুসর ধুসর শ্যাওলা। বিবর্ণ এবং স্থায়ীভাবেই উধাও। 

২০১৫ সালে বাঁকুড়া বইমেলায় যখন আমার প্রথম কবিতার বই বেরোলো 'হৃদি ডুবে যায়', নাম ভুলে যাওয়া এক নবীনকিশোর, যাকে ভুবনডাঙার একলা আকাশ, মেঘলা আকাশ কিছুই দিতে পারিনি। বইটি নিয়ে সে শুধু বলেছিলো, "একটি সই করে দাও।" আমি উত্তেজনায় শুধু নামটুকুই কোনোমতে লিখে দিতে পেরেছিলাম। বুঝেছিলাম, দিনের পর দিন খাতার পিছনে সই করার পরিশ্রম বিফলেই গেছে। যে যত্নে সেদিন নিজের নামটি এক থেকে অজস্রবার লিখবার চেষ্টা করতাম, আজ আর তা পারলাম কই? 

এখনো পারিনি। পারিনা। শুধু সময়, আমি তোমার কাছে জীবন রাখলাম। যা দেখলাম, তাই লিখছি। যা বুঝলাম, তাই বলছি। শুধু সময়, আমি তোমার কাছে জীবন বেঁধে রাখি। 

Sunday, August 9, 2020

যেটুকু জেনেছি একা


দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

জলের অতলে মাছ। অসংযত পাখনার ঢেউ।

পরম্পরাগত এই সব ক্রিয়ার কথা 

অক্ষরে লেখা ছিল না কোনোদিন।


সুদূর বালিকাকে ভেবে ভেবে কতদিন

সন্ধ্যা নামিয়েছি পলক ফেলে অর্বুদ অর্বুদ

কতবার ঘুমের ভেতর অরণ্যপ্রশ্বাস এসে 

উড়িয়ে নিয়ে গেছে...নিয়ে গেছে

প্রত্নতাত্ত্বিক ভোর ফেলে রেখে।


জলের ভেতর মাছ, ঘুমের ভেতর মেয়ে 

পথঘাট ভেজা ভেজা। কিছুটা পিচ্ছিল। 

কিছুটা আলোকিত। 


মেঘের তলদেশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি সারারাত...

Thursday, August 6, 2020

কেউ যায়, কেউ ফিরে আসে

দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

তখন রোদের দিন। সকালে রিটায়ার্ড মামিমা সংসারের সামান্য কাজে ব্যস্ত। কখনো বৌমার সঙ্গে টুকটাক হাতে হাত লাগিয়ে। কখনো কাজের লোকটিকে বুঝিয়ে দেওয়া। মামার চোখ একদৃষ্টিতে স্থির টিভির দিকে। খবরের চ্যানেলে। সোফায় হেলান দিয়ে নরম বালিশটা কোলে চাপিয়ে দোল খেতে খেতে শুনে যাচ্ছে কোভিড ১৯ কথা। কোথায় কত মৃত্যু। কোথায় কত সংক্রমণ। এমনিতেই কিডনি, সুগার, প্রেসারের চক্রব্যূহে মামা এক অভিজ্ঞ অভিমন্যু। কিছুক্ষণ দোল খেতে খেতে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল...

যৌবনে ঢুলু ঢুলু রাত নামতো গ্রামে। রাত নামতো ঠিক দুর্গাপুজোর পর। হলুদ বাল্বের সামান্য আলোর চেয়েও প্রাক কোজাগরীর জ্যোৎস্নায় ভেসে যেত গ্রামের গলি, রাস্তা সবকিছু। শারদীয়ায় সৌখিন যাত্রার আসরে নায়ক মানে তো মামাই। অমন ফর্সা ধবধবে ঝাঁকড়া কুচকুচে চুলের মানুষটি দরাজ গলায় যখন বিহ্বল হয়ে প্রেমিকাকে বলতো, "আমার কথাটা ভাববে না তুমি? আমার বুকে একটিবার কান পেতে দ্যাখো, কার নাম বেজে চলেছে প্রতিটি কম্পনে..." তারপর ধীরে ধীরে মঞ্চের আলো নীল হয়ে আসতো। বাঁশির পাতলা বিলম্বিতের আবহে সেই দৃশ্যে প্রতিটি যুবক, সদ্য বিবাহিতরা আবেগঘন দৃষ্টিতে নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকতো নীল আলোর ভেতর দুজন আলো অন্ধকার মানুষের দিকে। আবার নীল আলো সরিয়ে মঞ্চের ওপর পরিস্কার আলো পড়লেই নায়িকা গ্রিনরুমে ছুটে পালিয়েছে "দুষ্টু" বলে। মনে হয় প্রতিটি যাত্রারই একই সংলাপ। একই প্রস্থান। 

গ্রামের বা পাশাপাশি গ্রামের ভলিবল, ফুটবল প্রতিযোগিতায় ম্যাচ জিততো মামার জন্যই। টানটান উত্তেজনায় ম্যাচের জেতানোর গোল তো মামাই দিতো। দর্শকভরা মাঠে তখন শুধুই শ্বাস পতনের শব্দ। জালের ভেতর সজোরে বল ঢুকে যাওয়া মাত্রই ফর্সা চাবুকের মতো শরীরটা বেশ কিছুক্ষণ কাঁধবদল হয়ে সবুজ ছুঁতে পেতো।  

একসময়ের দাপুটে নকশাল নেতা আমার এক দাদু হঠাৎ বুকে একটা ব্যথা অনুভব করল। এখন তার সাতাত্তর চলছে। গত সপ্তাহেই পুরুলিয়া জেলা আদালতে একজনের কাজ করে ফিরে এসেছে। বরাবর আমি কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলে "মানুষের জন্য কাজ করতে হবে ভাই। মানুষ ছাড়া আমি চোখের সামনে কাউকেই দেখতে পাইনি।" ক'দিন আগেই বললাম, " তোমাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখছি। শেষ হলে দেখাবো।" বলল, "শুনেও ভালো লাগল। মরার আগে অন্তত বের করিস।"  

সন্তানহীন মানুষটি মাটির কুঁড়ে ঘর থেকে সোজা চলে গেল দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতলে। হৃদয়ের সমস্যা। কিচ্ছু করার নেই। যদিও এই বয়সেও খুব ডাকাবুকো মানুষটি একসময় পিস্তল, রিভলভার তো খেলনার মতো ব্যবহার করতো। তাই শ্বাসকষ্ট হলেও কিছুটা বেপরোয়া। 

ছেষট্টি বসন্তের মামাকে রাখা হলো আপতকালীন চিকিৎসার আওতায়। মুখে মাস্ক। হাতে চ্যানেল। গোটা শরীরে তারের জঙ্গল। কখনো চ্যানেল দিয়ে গড়িয়ে পড়েছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। কোনো ভ্রুক্ষেপ করার ক্ষমতাই নেই। একই হাসপাতালে ভর্তি আছে দাদুও। তারও মুখে মাস্ক। হাতে চ্যানেল। গোটা শরীরে তারের জঙ্গল। বাইরে থেকে দেখতে দুজনেই একই। মাঝখানে দূরত্ব রেখেছে এগারোটি বছর। 

দাদুর হার্টের অপারেশন হলো। পেসমেকার বসানো হলো। পাশাপাশি মামার ডায়ালিসিস। পরপর দুদিন। তৃতীয় দিনে চিকিৎসকরা দাদুর পরিবারকে জানালেন, "আজ ওনাকে ছুটি দেওয়া হলো। বাড়ি নিয়ে যান। সাবধানে রাখবেন।" মামার পরিবারকে জানানো হল, "তিনি আর নেই।" সত্যিই তো! তাকে আর সাবধানে রাখতে হবে না কোনোদিন। মামিমা হাত থেকে রিমোট ছাড়িয়ে বলবে না, "সবসময় আবার খবর কী? সিরিয়াল দেখবো ছাড়ো।"

হিমের মতো শাদা কাচের ঘরে শুধু নীলাভ মণির মতো দুটো চোখ তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে। অপলক দুটি চোখ। বেদনার দুটি চোখ। গ্রামের যাত্রায় একরাতের নকল প্রেমিকার দিকে তাকানো আসল স্বপ্নময় দুটি চোখ। মাকড়সার মতো কতো বর্ণময়তার জাল বোনা জীবন আজ প্রথম মেঘরঙের। একই জায়গা থেকে দুজনেই ফিরছে নিজ বাসভূমে। তবুও কেউ ফেরে। কেউ ফেরে না...

Wednesday, August 5, 2020

শুদ্ধ শুশ্রূষা


দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

আমি তো তোমারই খোঁজে গাত্রোত্থান করি
জল থেকে তুলে আনি অসুস্থ শামুক
জেনেছি গভীরে। পৃথিবীর সমস্ত শস্যের ভেতর
আমাদের জীবন খেলা করে। 
যেভাবে খেলা করে পিচ্ছিল মাছ
যেভাবেই তোমার অনুসারী খেলা।

রক্তবর্ণ মেঘ চলে যায় অনিকেত যাপনের দিকে
শিশিরের ঘ্রাণ নিতে নিতে ভুলে যাই
পৃথিবীর সমস্ত সংসার, সমস্ত সান্নিধ্য যদি 
এমনই শিশির হয়ে যেত। ঝরে ঝরে যেত 
বাকবন্ধ রাত্রির আনাচে কানাচে।

আমি শ্মশান সাম্রাজ্যে থাকি। অগ্নিগর্ভে
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখি হৃৎপিণ্ড পুড়ে যেতে
সঠিক কতটা সময় লাগে। মস্তিষ্ক পুড়ে গিয়ে 
ভেঙে যায় করোটি ধূসর। 

যদি একবার এসো চুপি চুপি। হাত ধরে বলো,
অনেক হয়েছে এই আগুনের সংলাপ।
শিশিরের কাছে কান পাতি চলো। 
শিশিরের স্বচ্ছ জলবিন্দু ফোঁটা ফোঁটা রাখো
চোখের দুটি তারার ওপরে। 

ছবি : অন্তর্জাল

এক ঘর, দশ উঠোন

দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায়  ওপরে উঠতে চাইছি। চাঁদ ঘোলাটে হয়ে গেল মধ্যরাতে।  সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে কৈশোর দেখছি। এখন রাত। যত ওপরের দিকে যাই... ততই কান্না ...