দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায়
তখন রোদের দিন। সকালে রিটায়ার্ড মামিমা সংসারের সামান্য কাজে ব্যস্ত। কখনো বৌমার সঙ্গে টুকটাক হাতে হাত লাগিয়ে। কখনো কাজের লোকটিকে বুঝিয়ে দেওয়া। মামার চোখ একদৃষ্টিতে স্থির টিভির দিকে। খবরের চ্যানেলে। সোফায় হেলান দিয়ে নরম বালিশটা কোলে চাপিয়ে দোল খেতে খেতে শুনে যাচ্ছে কোভিড ১৯ কথা। কোথায় কত মৃত্যু। কোথায় কত সংক্রমণ। এমনিতেই কিডনি, সুগার, প্রেসারের চক্রব্যূহে মামা এক অভিজ্ঞ অভিমন্যু। কিছুক্ষণ দোল খেতে খেতে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল...
যৌবনে ঢুলু ঢুলু রাত নামতো গ্রামে। রাত নামতো ঠিক দুর্গাপুজোর পর। হলুদ বাল্বের সামান্য আলোর চেয়েও প্রাক কোজাগরীর জ্যোৎস্নায় ভেসে যেত গ্রামের গলি, রাস্তা সবকিছু। শারদীয়ায় সৌখিন যাত্রার আসরে নায়ক মানে তো মামাই। অমন ফর্সা ধবধবে ঝাঁকড়া কুচকুচে চুলের মানুষটি দরাজ গলায় যখন বিহ্বল হয়ে প্রেমিকাকে বলতো, "আমার কথাটা ভাববে না তুমি? আমার বুকে একটিবার কান পেতে দ্যাখো, কার নাম বেজে চলেছে প্রতিটি কম্পনে..." তারপর ধীরে ধীরে মঞ্চের আলো নীল হয়ে আসতো। বাঁশির পাতলা বিলম্বিতের আবহে সেই দৃশ্যে প্রতিটি যুবক, সদ্য বিবাহিতরা আবেগঘন দৃষ্টিতে নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকতো নীল আলোর ভেতর দুজন আলো অন্ধকার মানুষের দিকে। আবার নীল আলো সরিয়ে মঞ্চের ওপর পরিস্কার আলো পড়লেই নায়িকা গ্রিনরুমে ছুটে পালিয়েছে "দুষ্টু" বলে। মনে হয় প্রতিটি যাত্রারই একই সংলাপ। একই প্রস্থান।
গ্রামের বা পাশাপাশি গ্রামের ভলিবল, ফুটবল প্রতিযোগিতায় ম্যাচ জিততো মামার জন্যই। টানটান উত্তেজনায় ম্যাচের জেতানোর গোল তো মামাই দিতো। দর্শকভরা মাঠে তখন শুধুই শ্বাস পতনের শব্দ। জালের ভেতর সজোরে বল ঢুকে যাওয়া মাত্রই ফর্সা চাবুকের মতো শরীরটা বেশ কিছুক্ষণ কাঁধবদল হয়ে সবুজ ছুঁতে পেতো।
একসময়ের দাপুটে নকশাল নেতা আমার এক দাদু হঠাৎ বুকে একটা ব্যথা অনুভব করল। এখন তার সাতাত্তর চলছে। গত সপ্তাহেই পুরুলিয়া জেলা আদালতে একজনের কাজ করে ফিরে এসেছে। বরাবর আমি কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলে "মানুষের জন্য কাজ করতে হবে ভাই। মানুষ ছাড়া আমি চোখের সামনে কাউকেই দেখতে পাইনি।" ক'দিন আগেই বললাম, " তোমাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখছি। শেষ হলে দেখাবো।" বলল, "শুনেও ভালো লাগল। মরার আগে অন্তত বের করিস।"
সন্তানহীন মানুষটি মাটির কুঁড়ে ঘর থেকে সোজা চলে গেল দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতলে। হৃদয়ের সমস্যা। কিচ্ছু করার নেই। যদিও এই বয়সেও খুব ডাকাবুকো মানুষটি একসময় পিস্তল, রিভলভার তো খেলনার মতো ব্যবহার করতো। তাই শ্বাসকষ্ট হলেও কিছুটা বেপরোয়া।
ছেষট্টি বসন্তের মামাকে রাখা হলো আপতকালীন চিকিৎসার আওতায়। মুখে মাস্ক। হাতে চ্যানেল। গোটা শরীরে তারের জঙ্গল। কখনো চ্যানেল দিয়ে গড়িয়ে পড়েছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। কোনো ভ্রুক্ষেপ করার ক্ষমতাই নেই। একই হাসপাতালে ভর্তি আছে দাদুও। তারও মুখে মাস্ক। হাতে চ্যানেল। গোটা শরীরে তারের জঙ্গল। বাইরে থেকে দেখতে দুজনেই একই। মাঝখানে দূরত্ব রেখেছে এগারোটি বছর।
দাদুর হার্টের অপারেশন হলো। পেসমেকার বসানো হলো। পাশাপাশি মামার ডায়ালিসিস। পরপর দুদিন। তৃতীয় দিনে চিকিৎসকরা দাদুর পরিবারকে জানালেন, "আজ ওনাকে ছুটি দেওয়া হলো। বাড়ি নিয়ে যান। সাবধানে রাখবেন।" মামার পরিবারকে জানানো হল, "তিনি আর নেই।" সত্যিই তো! তাকে আর সাবধানে রাখতে হবে না কোনোদিন। মামিমা হাত থেকে রিমোট ছাড়িয়ে বলবে না, "সবসময় আবার খবর কী? সিরিয়াল দেখবো ছাড়ো।"
হিমের মতো শাদা কাচের ঘরে শুধু নীলাভ মণির মতো দুটো চোখ তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে। অপলক দুটি চোখ। বেদনার দুটি চোখ। গ্রামের যাত্রায় একরাতের নকল প্রেমিকার দিকে তাকানো আসল স্বপ্নময় দুটি চোখ। মাকড়সার মতো কতো বর্ণময়তার জাল বোনা জীবন আজ প্রথম মেঘরঙের। একই জায়গা থেকে দুজনেই ফিরছে নিজ বাসভূমে। তবুও কেউ ফেরে। কেউ ফেরে না...