Sunday, August 30, 2020

এক ঘর, দশ উঠোন

দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

ওপরে উঠতে চাইছি। চাঁদ ঘোলাটে হয়ে গেল মধ্যরাতে। 

সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে কৈশোর দেখছি। এখন রাত।

যত ওপরের দিকে যাই...

ততই কান্না পায়। ততই অন্ধকার।


একলা হতে হতে ক্রমশ মনে পড়ে যাচ্ছে

একান্নবর্তী হাঁড়িশুদ্ধ ভাত কবেই আলাদা হয়ে গেছে 

সে এক বর্ষার দিনে। সে এক কাগজে কলমে।


কেঁদে কেঁদে খুঁজে চলেছি এক উঠোন। 

খুঁজে চলেছি...খুঁজে চলেছি...রঙিন জামা,

হাফপ্যান্টের পকেট। পকেটের ভেতর শুধুই অন্ধকার।


আমি আলাদা হয়ে যাচ্ছি। অন্তর্ঘাতে সবকিছু থেকে আলাদা।

Tuesday, August 11, 2020

আমার সইকথা



দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

"অটোগ্রাফ" শব্দটি কীভাবে জেনেছিলাম আজ আর বলতে পারবো না। হয়তো স্কুল পেরোচ্ছি যখন। তখন আর কতই বয়স। সতেরো অথবা সদ্য নাগরিকের স্বীকৃতি পেতে চলেছি তেমন বয়স। কীভাবে অটোগ্রাফ হয়, কারা দেন, কারা দিতে পারেন সেই সম্বন্ধে কোনো ধারণাই তো ছিলো না সেইসময়। একটু একটু মনে পড়ছে বুক থেকে স্বেচ্ছাসেবকের ব্যাজ খুলে এক যাত্রাশিল্পীর সই নিয়েছিল আমার মামার ছেলে। সেও আমাকে বলেছিল অটোগ্রাফ। তারপর বুঝতে শিখলাম অটোগ্রাফ কী। অটোগ্রাফের খাতাই বা কী। 

২০০৮ সালের ১৭ নভেম্বর (যদি ভুল না বলে থাকি) নন্দনে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের শেষ দিন। আমি উদভ্রান্তের মতো হাতে একটি ডায়েরি নিয়ে ঘুরছি। ঘুরছি অটোগ্রাফের আশায়। গ্রাম থেকে হঠাৎ এবং দ্বিতীয়বার মহানগরে যাওয়া আমি মৃণাল সেনের অটোগ্রাফ চাইতে পিছনে পিছনে গেলাম। উনি একটিও কথা না বলে রাজকীয় মেজাজে ভেতরে ঢুকে গেলেন প্রেক্ষাগৃহের বাদামি দরজার ওপারে। তক্ষুনি আমার ডান কাঁধটা ঝাঁকিয়ে একজন ঘুরিয়ে ওর দিকে আমাকে করে নিল। বলল, "জানো না, উনি অটোগ্রাফ দেন না!" সেই প্রথম কারো কাছে অটোগ্রাফ চাইতে গিয়ে বুঝেছিলাম এটি কী পরিমান পরম বস্তু। 

সরে এলাম যথেষ্ট অবাক হয়ে। কাঁচা মনে ভয়ও ধরেছিল বৈকি! ভেতরে প্রদর্শিত হবে রবীন্দ্রনাথের 'চতুরঙ্গ'। সিনেমার পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায় আমার সামনে দাঁড়িয়ে। পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেন দামিনী চরিত্রের ঋতুপর্ণা। এলেন কবীর সুমন। সেদিনের সন্ধ্যায় দেখেছিলাম রূপোলি পর্দার অনেক সোনালী মানুষ-মানুষীদের। আমার পরিশ্রম বিফলে যায় নি। একে একে অনেকেরই অটোগ্রাফ নিয়েছিলাম সেই হেমন্ত সন্ধ্যায়। হঠাৎ চারিদিকে সাইরেনের আওয়াজ। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রেক্ষাগৃহের দিকে এগিয়ে আসছেন। আমি উদগ্রীব। ওনারও অটোগ্রাফ চাই। পুলিশ আমাকে আটকালো। পিছনে অনেক লোক। আমি ছটফট করছিলাম। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থমকে দাঁড়ালেন। বললেন, "ওদের আসতে দাও।" আমি ও আমরা হুড়মুড়িয়ে ওনার পিছন পিছন প্রেক্ষাগৃহের বাদামি দরজা পর্যন্ত গেলাম। ধবধবে মানুষটি আলো অন্ধকারের ভেতরে ঢুকে গেলেন। আমি অটোগ্রাফ নেবার কথা ভুলেই গিয়েছি তখন।

কলেজবেলা থেকেই একটু বড়ো হচ্ছি ক্রমে ক্রমে। কতদিন বিভিন্নভাবে নিজের সই করে খাতার পিছন ভরিয়েছি। যদি কেউ আমারও অটোগ্রাফ নেয়! যদি কখনো আমিও দেবার যোগ্যতা পাই। যোগ্যতম হয়ে উঠতে পারি। সেই ভেবে কত দিন, কত কাল শুধু খাতার পিছন ভরিয়ে ভরিয়ে গোপনে নিজেকে প্রশ্রয় দিয়ে গেছি। পালন করতে পারিনি। বুঝেছি, প্রশ্রয় দেওয়া আর পালন করা এক জিনিস নয়। আজও অটোগ্রাফ দেওয়ার যোগ্যতমের কাছাকাছি অবস্থানও আমার একজীবনে কখনোই সম্ভব নয়। তাই সময়ের সান্নিধ্যে সেইসব খাতার দেওয়ালে ধুসর ধুসর শ্যাওলা। বিবর্ণ এবং স্থায়ীভাবেই উধাও। 

২০১৫ সালে বাঁকুড়া বইমেলায় যখন আমার প্রথম কবিতার বই বেরোলো 'হৃদি ডুবে যায়', নাম ভুলে যাওয়া এক নবীনকিশোর, যাকে ভুবনডাঙার একলা আকাশ, মেঘলা আকাশ কিছুই দিতে পারিনি। বইটি নিয়ে সে শুধু বলেছিলো, "একটি সই করে দাও।" আমি উত্তেজনায় শুধু নামটুকুই কোনোমতে লিখে দিতে পেরেছিলাম। বুঝেছিলাম, দিনের পর দিন খাতার পিছনে সই করার পরিশ্রম বিফলেই গেছে। যে যত্নে সেদিন নিজের নামটি এক থেকে অজস্রবার লিখবার চেষ্টা করতাম, আজ আর তা পারলাম কই? 

এখনো পারিনি। পারিনা। শুধু সময়, আমি তোমার কাছে জীবন রাখলাম। যা দেখলাম, তাই লিখছি। যা বুঝলাম, তাই বলছি। শুধু সময়, আমি তোমার কাছে জীবন বেঁধে রাখি। 

Sunday, August 9, 2020

যেটুকু জেনেছি একা


দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

জলের অতলে মাছ। অসংযত পাখনার ঢেউ।

পরম্পরাগত এই সব ক্রিয়ার কথা 

অক্ষরে লেখা ছিল না কোনোদিন।


সুদূর বালিকাকে ভেবে ভেবে কতদিন

সন্ধ্যা নামিয়েছি পলক ফেলে অর্বুদ অর্বুদ

কতবার ঘুমের ভেতর অরণ্যপ্রশ্বাস এসে 

উড়িয়ে নিয়ে গেছে...নিয়ে গেছে

প্রত্নতাত্ত্বিক ভোর ফেলে রেখে।


জলের ভেতর মাছ, ঘুমের ভেতর মেয়ে 

পথঘাট ভেজা ভেজা। কিছুটা পিচ্ছিল। 

কিছুটা আলোকিত। 


মেঘের তলদেশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি সারারাত...

Thursday, August 6, 2020

কেউ যায়, কেউ ফিরে আসে

দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

তখন রোদের দিন। সকালে রিটায়ার্ড মামিমা সংসারের সামান্য কাজে ব্যস্ত। কখনো বৌমার সঙ্গে টুকটাক হাতে হাত লাগিয়ে। কখনো কাজের লোকটিকে বুঝিয়ে দেওয়া। মামার চোখ একদৃষ্টিতে স্থির টিভির দিকে। খবরের চ্যানেলে। সোফায় হেলান দিয়ে নরম বালিশটা কোলে চাপিয়ে দোল খেতে খেতে শুনে যাচ্ছে কোভিড ১৯ কথা। কোথায় কত মৃত্যু। কোথায় কত সংক্রমণ। এমনিতেই কিডনি, সুগার, প্রেসারের চক্রব্যূহে মামা এক অভিজ্ঞ অভিমন্যু। কিছুক্ষণ দোল খেতে খেতে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল...

যৌবনে ঢুলু ঢুলু রাত নামতো গ্রামে। রাত নামতো ঠিক দুর্গাপুজোর পর। হলুদ বাল্বের সামান্য আলোর চেয়েও প্রাক কোজাগরীর জ্যোৎস্নায় ভেসে যেত গ্রামের গলি, রাস্তা সবকিছু। শারদীয়ায় সৌখিন যাত্রার আসরে নায়ক মানে তো মামাই। অমন ফর্সা ধবধবে ঝাঁকড়া কুচকুচে চুলের মানুষটি দরাজ গলায় যখন বিহ্বল হয়ে প্রেমিকাকে বলতো, "আমার কথাটা ভাববে না তুমি? আমার বুকে একটিবার কান পেতে দ্যাখো, কার নাম বেজে চলেছে প্রতিটি কম্পনে..." তারপর ধীরে ধীরে মঞ্চের আলো নীল হয়ে আসতো। বাঁশির পাতলা বিলম্বিতের আবহে সেই দৃশ্যে প্রতিটি যুবক, সদ্য বিবাহিতরা আবেগঘন দৃষ্টিতে নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকতো নীল আলোর ভেতর দুজন আলো অন্ধকার মানুষের দিকে। আবার নীল আলো সরিয়ে মঞ্চের ওপর পরিস্কার আলো পড়লেই নায়িকা গ্রিনরুমে ছুটে পালিয়েছে "দুষ্টু" বলে। মনে হয় প্রতিটি যাত্রারই একই সংলাপ। একই প্রস্থান। 

গ্রামের বা পাশাপাশি গ্রামের ভলিবল, ফুটবল প্রতিযোগিতায় ম্যাচ জিততো মামার জন্যই। টানটান উত্তেজনায় ম্যাচের জেতানোর গোল তো মামাই দিতো। দর্শকভরা মাঠে তখন শুধুই শ্বাস পতনের শব্দ। জালের ভেতর সজোরে বল ঢুকে যাওয়া মাত্রই ফর্সা চাবুকের মতো শরীরটা বেশ কিছুক্ষণ কাঁধবদল হয়ে সবুজ ছুঁতে পেতো।  

একসময়ের দাপুটে নকশাল নেতা আমার এক দাদু হঠাৎ বুকে একটা ব্যথা অনুভব করল। এখন তার সাতাত্তর চলছে। গত সপ্তাহেই পুরুলিয়া জেলা আদালতে একজনের কাজ করে ফিরে এসেছে। বরাবর আমি কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলে "মানুষের জন্য কাজ করতে হবে ভাই। মানুষ ছাড়া আমি চোখের সামনে কাউকেই দেখতে পাইনি।" ক'দিন আগেই বললাম, " তোমাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখছি। শেষ হলে দেখাবো।" বলল, "শুনেও ভালো লাগল। মরার আগে অন্তত বের করিস।"  

সন্তানহীন মানুষটি মাটির কুঁড়ে ঘর থেকে সোজা চলে গেল দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতলে। হৃদয়ের সমস্যা। কিচ্ছু করার নেই। যদিও এই বয়সেও খুব ডাকাবুকো মানুষটি একসময় পিস্তল, রিভলভার তো খেলনার মতো ব্যবহার করতো। তাই শ্বাসকষ্ট হলেও কিছুটা বেপরোয়া। 

ছেষট্টি বসন্তের মামাকে রাখা হলো আপতকালীন চিকিৎসার আওতায়। মুখে মাস্ক। হাতে চ্যানেল। গোটা শরীরে তারের জঙ্গল। কখনো চ্যানেল দিয়ে গড়িয়ে পড়েছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। কোনো ভ্রুক্ষেপ করার ক্ষমতাই নেই। একই হাসপাতালে ভর্তি আছে দাদুও। তারও মুখে মাস্ক। হাতে চ্যানেল। গোটা শরীরে তারের জঙ্গল। বাইরে থেকে দেখতে দুজনেই একই। মাঝখানে দূরত্ব রেখেছে এগারোটি বছর। 

দাদুর হার্টের অপারেশন হলো। পেসমেকার বসানো হলো। পাশাপাশি মামার ডায়ালিসিস। পরপর দুদিন। তৃতীয় দিনে চিকিৎসকরা দাদুর পরিবারকে জানালেন, "আজ ওনাকে ছুটি দেওয়া হলো। বাড়ি নিয়ে যান। সাবধানে রাখবেন।" মামার পরিবারকে জানানো হল, "তিনি আর নেই।" সত্যিই তো! তাকে আর সাবধানে রাখতে হবে না কোনোদিন। মামিমা হাত থেকে রিমোট ছাড়িয়ে বলবে না, "সবসময় আবার খবর কী? সিরিয়াল দেখবো ছাড়ো।"

হিমের মতো শাদা কাচের ঘরে শুধু নীলাভ মণির মতো দুটো চোখ তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে। অপলক দুটি চোখ। বেদনার দুটি চোখ। গ্রামের যাত্রায় একরাতের নকল প্রেমিকার দিকে তাকানো আসল স্বপ্নময় দুটি চোখ। মাকড়সার মতো কতো বর্ণময়তার জাল বোনা জীবন আজ প্রথম মেঘরঙের। একই জায়গা থেকে দুজনেই ফিরছে নিজ বাসভূমে। তবুও কেউ ফেরে। কেউ ফেরে না...

Wednesday, August 5, 2020

শুদ্ধ শুশ্রূষা


দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

আমি তো তোমারই খোঁজে গাত্রোত্থান করি
জল থেকে তুলে আনি অসুস্থ শামুক
জেনেছি গভীরে। পৃথিবীর সমস্ত শস্যের ভেতর
আমাদের জীবন খেলা করে। 
যেভাবে খেলা করে পিচ্ছিল মাছ
যেভাবেই তোমার অনুসারী খেলা।

রক্তবর্ণ মেঘ চলে যায় অনিকেত যাপনের দিকে
শিশিরের ঘ্রাণ নিতে নিতে ভুলে যাই
পৃথিবীর সমস্ত সংসার, সমস্ত সান্নিধ্য যদি 
এমনই শিশির হয়ে যেত। ঝরে ঝরে যেত 
বাকবন্ধ রাত্রির আনাচে কানাচে।

আমি শ্মশান সাম্রাজ্যে থাকি। অগ্নিগর্ভে
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখি হৃৎপিণ্ড পুড়ে যেতে
সঠিক কতটা সময় লাগে। মস্তিষ্ক পুড়ে গিয়ে 
ভেঙে যায় করোটি ধূসর। 

যদি একবার এসো চুপি চুপি। হাত ধরে বলো,
অনেক হয়েছে এই আগুনের সংলাপ।
শিশিরের কাছে কান পাতি চলো। 
শিশিরের স্বচ্ছ জলবিন্দু ফোঁটা ফোঁটা রাখো
চোখের দুটি তারার ওপরে। 

ছবি : অন্তর্জাল

Friday, July 31, 2020

আমাকে ব্যথা দাও আগুনবেলার দহনদিনে




দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

লম্বা লেন্সওয়ালা ক্যামেরা নিয়ে আমিও অনেকবার চলে গেছি রাঙামেটিয়ার জঙ্গলে, কংসাবতীর তীরে, মুকুটমণিপুরের ছলাৎ ছল জলের কাছে। গ্রীষ্মের দহনবেলায় তখন আমার চৈতন্য মগ্ন হয়েছিল ফড়িংয়ের গায়ে, দুধরাজের লেজে নয়তো নৌকোর ডোগায়। মাথার ওপর রোদের শামিয়ানা। নিচে শরীর। খাঁ খাঁ বেলাভূমিতে কচুরিপানা পাতার ওপর একটি রক্তিম ফড়িং। লেন্স তাক করে রইলাম। ওর বড়োই অস্থিরতা। ফিরতে ফিরতে সেই দুপুর। 

প্রচন্ড গরমে ছটফট করছে বোন। তলপেটে ব্যথা। কুঁকড়ে যাচ্ছে মাঝেমাঝেই। আমি শুধুই তাকিয়ে আছি অসহায় দুটি চোখে। বাবা পাশে বসে। মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে পেটে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আমি নিরুপায়। গাড়ি ডাকার জন্য ফোন বের করছি অমনি কষ্ট করেই বোন বলল, "গাড়ি ডাকতে হবে না রে দাদা। একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে।" আমি মাকে রান্নাঘরে, বাবাকে স্নানে পাঠিয়ে বোনের কাছে চুপ করে বসে রইলাম। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দিতে বলল, " ব্যাথাটা একটু কমছে। পাশে তাকিয়ে দ্যাখ্, কী করেছি।" পালঙ্কের নরমে একদিকে তখন পড়ে রয়েছে ওর ছুঁচ আর সুতো। সুতির কাপড়ের ওপর অসমাপ্ত নিপুন নকশাটি। ব্যাথা ছেড়ে উঠে গেলেই আবার কাপড়ে নকশা তুলবে। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ নিজের ভেতর ওকে ঢুকিয়ে রেখে বলি সব ব্যথা আমার...আমার...

অনির্বাণ তখন বিষ্ণুপুরে। তার ক্যামেরার লেন্সে একে একে ধরা পড়ছে মল্ল রাজাদের আশ্চর্য স্থাপত্য কীর্তি। জোড়বাংলা, রাসমঞ্চ, গড়দরজা কত কী। হঠাৎ পেটের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া ছেলেটা বসে পড়েছে লাল মাটির ওপর। হাত থেকে ক্যামেরাটা কোনোমতে নামিয়ে রেখেছে মাটিতে। কেউ কোত্থাও নেই। জানেই না পেটে ব্যথা হলে কেমন লাগে। প্রথম ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটা ছোট হয়ে যায়। আমি পরে সব জানতে পারি। ওকে বোনের মতো করে জড়িয়ে ধরে নিজের ভেতর রাখতে পারি না। বলতে পারি না সব ব্যথা আমার...আমার...। সে তো আমার কাছে থাকে না। ভাবতে বসি কেন এত ব্যথা শুধু পেটের ভেতর? 

ব্যথা কমে যায় ওকে কৃপা করে। আবার ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে সে ক্লিক করতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে পঞ্চরত্ন মন্দিরের চূড়ো। রাতের অন্ধকার নেমে এলে তুঁত রঙের গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে পেরিয়ে পেরিয়ে আসে নাকাইজুড়ির জঙ্গল, ছাগুলিয়ার গ্রামপথ, জয়পণ্ডা নদীর সেতু, নিজের গলির ভেতর। ডান হাতের আমগাছটা এক বুক অভিমানে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন সে অনির্বাণের প্রবেশ প্রস্থানের প্রতিক্রিয়াহীন সাক্ষী থেকে যায়। অনির্বাণ কি আদৌ বুঝতে পারে একা আমগাছের আন্তরিক অভিমান? 

আমি ওর কাছে চলে যাই কোনো কোনো দিন খেয়ালবশে। তখন একদিনও ওর ব্যথা হয় না। ওকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ দেয় না। অথচ মাঝে মাঝেই ওর ব্যথা জন্মে। পাকস্থলীর ওপরে যে আয়না, সেখানে গভীর ক্ষত আছে। তার দায় নিতে হচ্ছে নিচের অংশকে। আমি খবর পাই। ফোনে জানতে পারি ওর ব্যথার ইতিহাস। শুশ্রূষার নিয়ম। অথচ ছুঁয়ে থাকতে পারি না। প্রচন্ড রোদ দিচ্ছে। আকাশ থেকে যেন আগুনবৃষ্টি হচ্ছে। একজন ব্যথা পেটে কাপড়ে সুদৃশ্য ফুল তোলে, জ্যোৎস্নার জল আঁকে। আরেকজন লেন্সে বন্দি করে গ্রীষ্মের বালুচরির আঁচল, প্রজাপতির জন্মবৃত্তান্ত। 

একদিন প্রচণ্ড দুপুর। একটা বই পড়তে পড়তে হঠাৎ দুজনের কথা মনে পড়ে গেল। দুজনের ব্যথার কথা। কীভাবে পেটের মোচড় ওদের সাময়িক জখম করে পরমুহূর্তেই সৃজনের কাছে পৌঁছায়? প্রশ্নচিহ্ন সঙ্গে নিয়েই ঘর থেকে উত্তরে সাহেববাঁধের দিকে হেঁটে গেলাম। সঙ্গে ক্যামেরা। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম ঠা ঠা রোদের নিচে। শুকনো ঘাসে এসে প্রজাপতি ডানা মেললো না। আকাশ কালো করে মেঘ এলো না। একলা রোদের দুপুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলাম, "ব্যথা দাও...ব্যথা দাও...আমিও কাঁথা স্টিচের ফুল আঁকতে চাই। আমিও প্রজাপতির জীবনচক্র ধরে রাখতে চাই।" আমার চিৎকার রোদের তীব্রতায় একটু একটু করে ঝলসে যেতে থাকলো। মিলিয়ে যেতে থাকল আগুনবেলার দহনদিনে। তবু আমার জন্য পেটের ভেতর মোচড় দেওয়া কোনও ব্যথা এলো না।

ছায়াবৃত্ত

















দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায়

এই তো কিছুক্ষণ হলো ময়ূখ নেট অফ করে জানালার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি। কখনো টিপ্ টিপ্। মানিপ্ল্যান্টের কাঁচা পাতাগুলো এই বর্ষায় আরো সবুজ দেখাচ্ছে। সোফায় বসে থাকা ময়ূখের চোখে তখন আষাঢ়ের থৈ থৈ। কোথায় যাওয়া যায় এখন? ভাবছে শহর ছাড়িয়ে ব্যাণ্ডেলের দিকটা একবার ঘুরে আসা যাক। আবার চোখ ফেরায় বুক সেলফটার দিকে। ফ্ল্যাটটার ইন্টিরিয়র ডিজাইন চমৎকার। ডিজাইনার সমঝদার লোক মানতেই হবে। সলমন রুশদির বইয়ের পাশেই অহনার ছবিটা ওর দিকে তাকিয়ে। 

- রাজনদা একটু চা করো তো? 
বসে থেকেই কাজের লোক রাজনকে হাঁক দিল। তারপরেই একটা বাংলা পত্রিকার পাতা ওল্টাতে থাকল। সাহিত্য নির্ভর পত্রিকা। তবুও দেশ, কাল, সমসময় নিয়ে সম্পাদক খুবই সচেতন। পাতায় পাতায় তারই ছাপ রেখেছে। ভেতরে বিভিন্ন কবির একগুচ্ছ কবিতা। ফাঁকে ফাঁকে নীল, হলুদ প্যাস্টেলের ইলাস্ট্রেশন। ময়ূখ কবিতায় চোখ আটকে একটা সিগারেট ধরাল। রাজন চা এনে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, 
- দাদা, আজ খিচুড়ি করলে কেমন হয়? এই আবহাওয়ায় খেতে ভালোই লাগবে। গত কালকের চিকেনটা একটু ফ্রিজে রাখা আছে। কষে দিলে মন্দ হতো না।
- তাই করো। ভেবেছিলাম একটু বেরোব। একা একা বোরিং লাগছে। কিন্তু যাবোই কোথায়? জল কাদায় সব জায়গায় তো একই অবস্থা।
রাজন বলল, 
- বিকেলে বৃষ্টি থেমে গেলে তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবো। যেখানে তুমি কখনো যাও নি।
- কোথায় সেটা? 
- এই শহরেই। তুমি যাও নি। আমি এই শহরের লোক কি না। তাই জানি। সে গেলেই বুঝতে পারবে। 

রাজন চলে যেতেই ময়ূখ আবার কবিতায় চোখ রাখল। আজ তার অফিস ছুটি। কিছুই ভালো লাগছে না তার। কারণ অহনা হঠাৎ করেই ব্রেক আপ করে দেবে ভাবতেই পারে নি। সেলিব্রিটি হওয়ার যে কি জ্বালা তা এতদিনে হাড়ে হাড়ে ময়ূখ টের পাচ্ছে। আসলে এবারের বইমেলায় অহনার ফেমিনিজম নিয়ে লেখা বইটা বেস্ট সেলার হয়েছে। দু মাসেই তৃতীয় সংস্করণ শেষ। বইয়ের পাতায় অটোগ্রাফ দিতে দিতে আঙুলে ব্যথা ধরে যাওয়ার জোগাড়। সেই থেকেই অহনার কেমন যেন একটু গা ছাড়া ভাব। অথচ একসময় ময়ূখ ছাড়া অহনা নির্ভরযোগ্য দ্বিতীয় কাউকেই ভাবতে পারেনি। ময়ূখকে ক্যাফেটেরিয়ায় কফি খেতে খেতে এক বসন্তের বিকেলে অহনা বলেছিল,
- তোমার মতো যদি কবিতা লিখতে পারতাম! তবে দেখো, প্রথমবার আমাদের ছেলেই হবে। 
ময়ূখ মাথা নেড়ে বলেছিল, 
- আমি রবি ঠাকুরের কাছে মানত করেছি যেন মেয়ে হয়। নাম দেব কৃষ্ণকলি। 
অহনার মুখে গোধূলি আলো পড়ে গালের ওপর ফুটে ওঠা নীল শিরাগুলি আশ্চর্য দেখাচ্ছিল। শিল্পীর আঁকার চেয়েও আশ্চর্য! 

বারো দিন ওদের কোনো কথোপকথন নেই। যদিও কথাবার্তা বন্ধ এর আগেও অনেকবার হয়েছে। তবে সেটা বেশি হলে চারদিন। চারদিন পেরিয়ে গেলে অহনাই হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ দিয়ে বলে, "কথা না বলে থাকাটা কোনো কাজের কথা নয়। ওটাকে দায়িত্ব এড়ানো বলে।" অমনি ময়ূখও কিছু লিখে দেয়। এইভাবে চারদিনের বন্ধ কথা চার মিনিটেই সংলাপে সংলাপে মুখর হয়ে যেত। বারো দিন হয়ে গেল। বৃষ্টিতে পর্দার ওপারে গ্লাস উইন্ডোটা ভিজে কখনো কখনো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মেঘের নিচে তখন শহরের ঘরবাড়ি কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ফোনটা নিয়ে ময়ূখ অহনাকে ফোন করল। প্রথমবার পুরো রিং হয়ে কেটে গেল। আবার করল। কিছুক্ষণ রিং হবার পর অহনা বলল, 
- প্লিজ ময়ূখ। নিজেকে বেশি চালাক ভেবো না। আর নিজেকে বেশি সৎ, সরল ভাবাটাও তোমার একটা চালাকি। আমাকে দু সপ্তাহের মধ্যে একটা উপন্যাস শেষ করতে হবে। রাখছি।
- বিষয় কি?
- সেটা তোমার না জানলেও চলবে। যারা আমার সুহৃদ তাদের ঠিক সময়ে জানিয়ে দেব। তুমি আর ফোন করো না। না হলে ব্লক করতে বাধ্য হবো।

কেটে যাওয়া ফোনটা পাশে নামিয়ে রেখেই একটা সিগারেট ওর ঠোঁটে গিয়ে উঠল। বাইরে থেকে দেখা না গেলেও ওর গোটা শরীরের ভেতর কাঁপছে। ভয়ে নয়, রাগেও নয়। উত্তেজনায়। সে ভেবে পাচ্ছে না সে কী এমন করেছে যার জন্য অহনা এমন রিয়েক্ট করল। সবসময় সে অহনাকেই ভালোবাসে। ভালোবাসার মানুষের সাথে আর যাই হোক চালাকি চলে না। সেটা ময়ূখের থেকে অহনাও হয়তো ভালো বোঝে না। ফেমিনিজম নিয়ে বইটা লেখার পর থেকেই সামান্য কারণেই অহনা প্রচণ্ড তর্ক করে। ময়ূখের ভালো লাগে না। একটা কোম্পানিতে ভালো পদে চাকরি করা ময়ূখের পারফিউমের গন্ধ নিতে উজ্জয়িনী কতবার ওর কাছে কাছে ঘুরেছে। সে মোটেও পাত্তা দেয় নি। বরং ল্যাপটপ অন করে স্ক্রিনে অহনার দিকেই কাজের ফাঁকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

অহনা লেখার টেবিলে বসে মায়ের বানানো কফি মগে চুমুক দিতে দিতে লেখার পাতা থেকে একটা লাইনের পুরোটাই কেটে দিল। তারপর ফোন করে বলল,
- শোন্ রিতম, সময়টা একটু বাড়িয়ে দে না রে। দু সপ্তাহটা বড্ড কম। আর পাঁচ দিন বেশি দে। 
ও প্রান্ত থেকে রিতম বলল, 
- আচ্ছা তাই নাও। তোমার মর্জি। 
- ধুর! কি যে বলিস? 
- বলছি, শোনো না। আজ বিকেলে একবার তোমার কাছে যাবো? বৃষ্টি দিনে তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। 
- সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আসিস। সঙ্গে এক প্যাকেট কিং সাইজ। 
- তার মানে তোমার মা বিকেলে থাকবে না?
- না। ছোটমামা আসবে। ও মাকে নিয়ে মামাবাড়ি যাবে। রাতে আবার দিয়ে যাবে।
ফোন রেখে দিয়ে অহনা লেখায় মন দিল। 

কলিংবেলে চাপ দিতেই কাজের মাসি দরজা খুলে দিল। রিতম সোজা ওপরে উঠে দেখে অহনা বালিশ জড়িয়ে শুয়ে আছে। রিতমকে দেখেই বলল,
- এসেছিস। বোস। 
উঠে বসল অহনা। ও বালিশটা কোলের কাছে নিয়ে দোল খেতে খেতে গল্প শুরু করল। প্রতিবার নুয়ে পড়লেই গলার কাছে টপের বিশাল হাঁ দিয়ে অহনার বুকের ভাঁজ দেখা যাচ্ছে। রিতমের চোখ সেই দিকেই। অহনা বুঝতে পারে। তবুও ভ্রুক্ষেপ করে না। রিতম বেশ কিছুক্ষণ পর বলল,
- তোমার শরীরের গন্ধটা দারুন। কেমন যেন ঘোর লাগা একটা গন্ধ। 
- তোরা ছেলেরা না মেয়ে দেখলেই গন্ধ পাস। কই আমরা তো পাই না।
রিতম বলল,
- কে বলেছে তোমরা পাও না। প্রমাণ চাও?
অহনা কিছুটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
- দে তো দেখি। 
রিতম একটা সিগারেট ধরাল। সামান্য একটু খেয়ে ছাইদানিতে ঘসে দিয়ে ডান হাতের তর্জনি ও মধ্যমা অহনার নাকের কাছে ধরল। অহনা একটু একটু করে মৃদু ঘ্রাণ নিতে নিতে কেমন যেন মোহিত হয়ে গেল। রিতমের হাতটা ঘাড় থেকে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে ওকে আরো কাছে টেনে নিল। রিতমও ওর নাক, ঠোঁট অহনার কানের নিচে, ঘাড়ে, বুকের ভাঁজে ডুবিয়ে মেয়েলি গন্ধে ঘোর হয়ে যেতে থাকল। নরম বিছানায় অসম বয়সী দুজন তখন তুমুল হয়ে উঠেছে। একটু পরেই বাইরে বৃষ্টি থেমে গেল। অল্প রোদ উঠল। আলুথালু অহনা রিতমকে বিছানায় পাশে ফেলে দিয়ে জানালার কাছে গিয়ে সিগারেট ধরাল। 

রাজন কয়েকদিন ধরেই লক্ষ্য করছে ময়ূখ বেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। বেশিরভাগ সময় একা থাকতে চাইছে। রাজন দু একটা বেশি কথা বললেই রেগে আগুন হয়ে উঠছে। অথচ মাসখানেক আগেও ময়ূখ কত হাসিখুশি থাকত তা এই মুহূর্তে রাজন ছাড়া কেউই ভালো জানে না। রাজন বেশি বেতনে অন্য বাড়ির কাজের সুযোগ পেয়েও ময়ূখকে ছেড়ে যায় নি একমাত্র ওর সরলতার জন্যই। যদিও আজকের বিকেলে ময়ূখকে কিছুটা শান্তই দেখল রাজন। কিছুটা উত্তেজনাহীন। কিছুটা উত্তাপহীন। রাজনকে কাজের অছিলায় ভেতরের ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে অহনাকে আবার ফোন করল ময়ূখ।
- হ্যালো, বলছি এখন আশা করি রাগ কমেছে। যদিও রাগের কারণ আমি অনেক চেষ্টা করেও এখনো খুঁজে পাচ্ছি না। উপন্যাসটি কবে থেকে শুরু করলে?
অহনা কিছুটা নিস্তেজ। সিগারেটের ধোঁয়াটা একমুখ জানালার বাইরে পাশের সদ্য বৃষ্টি ভেজা নারকেল গাছটার মাথার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, 
- তোমার ল্যাপটপের স্ক্রীনে এবার থেকে অন্য ছবি রেখো? আর বুক সেলফ থেকেও আমার ছবিটা পারলে সরিয়ে দিও। আমি এখান থেকেই খুশি হবো।
পরিস্থিতি হালকা করতে ময়ূখ বলল,
- সে না হয় করবো। কিন্তু উপন্যাসটি কী বিষয়ের ওপর লিখছো বললে না যে?
- আচ্ছা, আমি যে তোমাকে বলতে চাইছি না, সেটা কি তুমি বুঝতেই চাইছো না? নাকি না বোঝার ভান করছো? 
ময়ূখ ইতস্ততঃ হয়ে বলল,
- হঠাৎ কী হয়ে গেল তোমার? দু সপ্তাহ আগেও তো তুমি এমন ছিলে না?
- ও! তার মানে তুমি বলতে চাও আমার স্বাধীনতা বলে কিছুই থাকবে না? তোমার বশীভূত হয়ে চলতে হবে নাকি?
অহনার গলায় কিছুটা আক্রোশের সুর। রিতম বিছানায় নেতিয়ে পড়ে অহনার দিকে তাকিয়ে আছে। বিরক্তি প্রকাশ করে অহনা ফোন কেটে দিল। 

রাজন কিছুটা লেখাপড়া জানে। অবাঙালি এবং বিশ্বস্ত। সে ময়ূখের ভাবগতি দেখে কিছু একটা সন্দেহ করতে শুরু করেছে। দূর থেকে বিভিন্ন কাজের অছিলায় দেখতে থাকল ময়ূখ কিছু একটা লিখছে। তখনো আকাশে রোদ আছে। তারপর লেখা কাগজটা নিয়ে নিজের ঘরে ড্রয়ারে রেখে বেরিয়ে এসেই বলল,
- কোথায় নিয়ে যাবে বলছিলে। যাবে না?
ময়ূখের কথার ভেতর রাজন সন্দেহ খুঁজে পাচ্ছে। ওকে বুঝতে না দিয়েই বলল,
- ঘরগুলো একটু পরিস্কার করে নিই। তারপর বেরোবো। 
ঘর পরিস্কার করার অছিলায় ওর টেবিলের কাগজগুলি গোছাতে গোছাতে ড্রয়ারটা টেনে সদ্য লিখে রাখা কাগজটি বের করে স্নানের ঘরে ঢুকে গেল। এ তো রীতিমতো সুইসাইড নোট! কাগজের লেখার ওপর বড়ো বড়ো চোখ করে রাজন শুধু অহনার ওপর ময়ূখের অভিমান পড়ে গেল। বেরিয়ে বলল, 
- রেডি হয়ে নাও। এবার বেরোবো।

সেলফ ড্রাইভার ময়ূখের ধূসর কালো চার চাকায় ওর পাশে বসে যেতে যেতেই রাজন ভেবে নিল যেখানে নিয়ে যাবে ভেবেছিল সেখানে যাবে না। যদিও কোথায় যাবে আগের থেকে ময়ূখ কিছুই জানে না। সন্ধে হয়ে এসেছে। একটা শুনশান জায়গায় গাড়িটা দাঁড়াল। রাজন গেট খুলে নেমে হনহন করে হেঁটে গেল। পিছনে ময়ূখ। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সে রাজনের পিছনে হেঁটে চলেছে। একটাও লোক নেই শহরের এই প্রান্তে। মূল রাস্তা থেকে জায়গাটি বেশ কিছুটা দূরে। চারদিকে গোল গ্যালারির মতো। ছোট বৃত্তাকার। নিচে সবুজ মাটি। প্লাস্টার খসে যাওয়া ভেঙে ভেঙে যাওয়া সিঁড়ি দিয়ে রাজন ময়ূখকে ওপরে তুলল। জায়গাটি দেখেই ময়ূখের মনে হল এখান থেকে ঝাঁপ দিলে মৃত্যু সম্পর্কে বিন্দুমাত্রও অনিশ্চয়তা থাকবে না। সে ঝাঁপ দেবার প্রস্তুতি নিতেই রাজন বলল,
- রাজাদের আমলের এটি তৈরি। শুনেছি এখানে অবৈধ সম্পর্কের কারণে কেউ অপরাধী সাব্যস্ত হলে তাদের দাঁড় করিয়ে রাজার পেয়াদা পিছন থেকে ঠেলে দিত। 
কথাটি শুনেই ময়ূখের বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। নিচের দিকে তাকাতেই দেখল, বেশ কয়েকজন তাকে দু হাত তুলে ডাকছে। তারা সবাই যুবক যুবতী। একটা ঘোরের মধ্যে ময়ূখ অন্য সিঁড়ি দিয়ে ওদের কাছে দ্রুত নেমে যেতে থাকল। রাজন বুঝতে পেরেই ওর পিছু নিল। সবুজ মাটিতে এসে ময়ূখ ইতস্ততঃ তাকিয়ে দেখল কেউ কোত্থাও নেই। রাজনকেও যেন দেখতে পেল না। যদিও রাজন তার পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে অদ্ভুত একটা নেশার মতো ঘোর হয়ে মাটিতে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল, গ্যালারির মতো দাঁড়াবার জায়গাটিতে অনেকগুলি অহনা এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে একসাথে সশব্দে হেসে চলেছে। ধীরে ধীরে ঘোলাটে অন্ধকার নেমে এল। মাঠ, ময়ূখ, রাজন এবং সম্পূর্ণ স্থাপত্যটি ঢেকে ফেলতে থাকল।

এক ঘর, দশ উঠোন

দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায়  ওপরে উঠতে চাইছি। চাঁদ ঘোলাটে হয়ে গেল মধ্যরাতে।  সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে কৈশোর দেখছি। এখন রাত। যত ওপরের দিকে যাই... ততই কান্না ...