Friday, July 31, 2020

আমাকে ব্যথা দাও আগুনবেলার দহনদিনে




দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

লম্বা লেন্সওয়ালা ক্যামেরা নিয়ে আমিও অনেকবার চলে গেছি রাঙামেটিয়ার জঙ্গলে, কংসাবতীর তীরে, মুকুটমণিপুরের ছলাৎ ছল জলের কাছে। গ্রীষ্মের দহনবেলায় তখন আমার চৈতন্য মগ্ন হয়েছিল ফড়িংয়ের গায়ে, দুধরাজের লেজে নয়তো নৌকোর ডোগায়। মাথার ওপর রোদের শামিয়ানা। নিচে শরীর। খাঁ খাঁ বেলাভূমিতে কচুরিপানা পাতার ওপর একটি রক্তিম ফড়িং। লেন্স তাক করে রইলাম। ওর বড়োই অস্থিরতা। ফিরতে ফিরতে সেই দুপুর। 

প্রচন্ড গরমে ছটফট করছে বোন। তলপেটে ব্যথা। কুঁকড়ে যাচ্ছে মাঝেমাঝেই। আমি শুধুই তাকিয়ে আছি অসহায় দুটি চোখে। বাবা পাশে বসে। মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে পেটে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আমি নিরুপায়। গাড়ি ডাকার জন্য ফোন বের করছি অমনি কষ্ট করেই বোন বলল, "গাড়ি ডাকতে হবে না রে দাদা। একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে।" আমি মাকে রান্নাঘরে, বাবাকে স্নানে পাঠিয়ে বোনের কাছে চুপ করে বসে রইলাম। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দিতে বলল, " ব্যাথাটা একটু কমছে। পাশে তাকিয়ে দ্যাখ্, কী করেছি।" পালঙ্কের নরমে একদিকে তখন পড়ে রয়েছে ওর ছুঁচ আর সুতো। সুতির কাপড়ের ওপর অসমাপ্ত নিপুন নকশাটি। ব্যাথা ছেড়ে উঠে গেলেই আবার কাপড়ে নকশা তুলবে। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ নিজের ভেতর ওকে ঢুকিয়ে রেখে বলি সব ব্যথা আমার...আমার...

অনির্বাণ তখন বিষ্ণুপুরে। তার ক্যামেরার লেন্সে একে একে ধরা পড়ছে মল্ল রাজাদের আশ্চর্য স্থাপত্য কীর্তি। জোড়বাংলা, রাসমঞ্চ, গড়দরজা কত কী। হঠাৎ পেটের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া ছেলেটা বসে পড়েছে লাল মাটির ওপর। হাত থেকে ক্যামেরাটা কোনোমতে নামিয়ে রেখেছে মাটিতে। কেউ কোত্থাও নেই। জানেই না পেটে ব্যথা হলে কেমন লাগে। প্রথম ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটা ছোট হয়ে যায়। আমি পরে সব জানতে পারি। ওকে বোনের মতো করে জড়িয়ে ধরে নিজের ভেতর রাখতে পারি না। বলতে পারি না সব ব্যথা আমার...আমার...। সে তো আমার কাছে থাকে না। ভাবতে বসি কেন এত ব্যথা শুধু পেটের ভেতর? 

ব্যথা কমে যায় ওকে কৃপা করে। আবার ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে সে ক্লিক করতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে পঞ্চরত্ন মন্দিরের চূড়ো। রাতের অন্ধকার নেমে এলে তুঁত রঙের গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে পেরিয়ে পেরিয়ে আসে নাকাইজুড়ির জঙ্গল, ছাগুলিয়ার গ্রামপথ, জয়পণ্ডা নদীর সেতু, নিজের গলির ভেতর। ডান হাতের আমগাছটা এক বুক অভিমানে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন সে অনির্বাণের প্রবেশ প্রস্থানের প্রতিক্রিয়াহীন সাক্ষী থেকে যায়। অনির্বাণ কি আদৌ বুঝতে পারে একা আমগাছের আন্তরিক অভিমান? 

আমি ওর কাছে চলে যাই কোনো কোনো দিন খেয়ালবশে। তখন একদিনও ওর ব্যথা হয় না। ওকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ দেয় না। অথচ মাঝে মাঝেই ওর ব্যথা জন্মে। পাকস্থলীর ওপরে যে আয়না, সেখানে গভীর ক্ষত আছে। তার দায় নিতে হচ্ছে নিচের অংশকে। আমি খবর পাই। ফোনে জানতে পারি ওর ব্যথার ইতিহাস। শুশ্রূষার নিয়ম। অথচ ছুঁয়ে থাকতে পারি না। প্রচন্ড রোদ দিচ্ছে। আকাশ থেকে যেন আগুনবৃষ্টি হচ্ছে। একজন ব্যথা পেটে কাপড়ে সুদৃশ্য ফুল তোলে, জ্যোৎস্নার জল আঁকে। আরেকজন লেন্সে বন্দি করে গ্রীষ্মের বালুচরির আঁচল, প্রজাপতির জন্মবৃত্তান্ত। 

একদিন প্রচণ্ড দুপুর। একটা বই পড়তে পড়তে হঠাৎ দুজনের কথা মনে পড়ে গেল। দুজনের ব্যথার কথা। কীভাবে পেটের মোচড় ওদের সাময়িক জখম করে পরমুহূর্তেই সৃজনের কাছে পৌঁছায়? প্রশ্নচিহ্ন সঙ্গে নিয়েই ঘর থেকে উত্তরে সাহেববাঁধের দিকে হেঁটে গেলাম। সঙ্গে ক্যামেরা। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম ঠা ঠা রোদের নিচে। শুকনো ঘাসে এসে প্রজাপতি ডানা মেললো না। আকাশ কালো করে মেঘ এলো না। একলা রোদের দুপুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলাম, "ব্যথা দাও...ব্যথা দাও...আমিও কাঁথা স্টিচের ফুল আঁকতে চাই। আমিও প্রজাপতির জীবনচক্র ধরে রাখতে চাই।" আমার চিৎকার রোদের তীব্রতায় একটু একটু করে ঝলসে যেতে থাকলো। মিলিয়ে যেতে থাকল আগুনবেলার দহনদিনে। তবু আমার জন্য পেটের ভেতর মোচড় দেওয়া কোনও ব্যথা এলো না।

ছায়াবৃত্ত

















দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায়

এই তো কিছুক্ষণ হলো ময়ূখ নেট অফ করে জানালার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি। কখনো টিপ্ টিপ্। মানিপ্ল্যান্টের কাঁচা পাতাগুলো এই বর্ষায় আরো সবুজ দেখাচ্ছে। সোফায় বসে থাকা ময়ূখের চোখে তখন আষাঢ়ের থৈ থৈ। কোথায় যাওয়া যায় এখন? ভাবছে শহর ছাড়িয়ে ব্যাণ্ডেলের দিকটা একবার ঘুরে আসা যাক। আবার চোখ ফেরায় বুক সেলফটার দিকে। ফ্ল্যাটটার ইন্টিরিয়র ডিজাইন চমৎকার। ডিজাইনার সমঝদার লোক মানতেই হবে। সলমন রুশদির বইয়ের পাশেই অহনার ছবিটা ওর দিকে তাকিয়ে। 

- রাজনদা একটু চা করো তো? 
বসে থেকেই কাজের লোক রাজনকে হাঁক দিল। তারপরেই একটা বাংলা পত্রিকার পাতা ওল্টাতে থাকল। সাহিত্য নির্ভর পত্রিকা। তবুও দেশ, কাল, সমসময় নিয়ে সম্পাদক খুবই সচেতন। পাতায় পাতায় তারই ছাপ রেখেছে। ভেতরে বিভিন্ন কবির একগুচ্ছ কবিতা। ফাঁকে ফাঁকে নীল, হলুদ প্যাস্টেলের ইলাস্ট্রেশন। ময়ূখ কবিতায় চোখ আটকে একটা সিগারেট ধরাল। রাজন চা এনে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, 
- দাদা, আজ খিচুড়ি করলে কেমন হয়? এই আবহাওয়ায় খেতে ভালোই লাগবে। গত কালকের চিকেনটা একটু ফ্রিজে রাখা আছে। কষে দিলে মন্দ হতো না।
- তাই করো। ভেবেছিলাম একটু বেরোব। একা একা বোরিং লাগছে। কিন্তু যাবোই কোথায়? জল কাদায় সব জায়গায় তো একই অবস্থা।
রাজন বলল, 
- বিকেলে বৃষ্টি থেমে গেলে তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবো। যেখানে তুমি কখনো যাও নি।
- কোথায় সেটা? 
- এই শহরেই। তুমি যাও নি। আমি এই শহরের লোক কি না। তাই জানি। সে গেলেই বুঝতে পারবে। 

রাজন চলে যেতেই ময়ূখ আবার কবিতায় চোখ রাখল। আজ তার অফিস ছুটি। কিছুই ভালো লাগছে না তার। কারণ অহনা হঠাৎ করেই ব্রেক আপ করে দেবে ভাবতেই পারে নি। সেলিব্রিটি হওয়ার যে কি জ্বালা তা এতদিনে হাড়ে হাড়ে ময়ূখ টের পাচ্ছে। আসলে এবারের বইমেলায় অহনার ফেমিনিজম নিয়ে লেখা বইটা বেস্ট সেলার হয়েছে। দু মাসেই তৃতীয় সংস্করণ শেষ। বইয়ের পাতায় অটোগ্রাফ দিতে দিতে আঙুলে ব্যথা ধরে যাওয়ার জোগাড়। সেই থেকেই অহনার কেমন যেন একটু গা ছাড়া ভাব। অথচ একসময় ময়ূখ ছাড়া অহনা নির্ভরযোগ্য দ্বিতীয় কাউকেই ভাবতে পারেনি। ময়ূখকে ক্যাফেটেরিয়ায় কফি খেতে খেতে এক বসন্তের বিকেলে অহনা বলেছিল,
- তোমার মতো যদি কবিতা লিখতে পারতাম! তবে দেখো, প্রথমবার আমাদের ছেলেই হবে। 
ময়ূখ মাথা নেড়ে বলেছিল, 
- আমি রবি ঠাকুরের কাছে মানত করেছি যেন মেয়ে হয়। নাম দেব কৃষ্ণকলি। 
অহনার মুখে গোধূলি আলো পড়ে গালের ওপর ফুটে ওঠা নীল শিরাগুলি আশ্চর্য দেখাচ্ছিল। শিল্পীর আঁকার চেয়েও আশ্চর্য! 

বারো দিন ওদের কোনো কথোপকথন নেই। যদিও কথাবার্তা বন্ধ এর আগেও অনেকবার হয়েছে। তবে সেটা বেশি হলে চারদিন। চারদিন পেরিয়ে গেলে অহনাই হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ দিয়ে বলে, "কথা না বলে থাকাটা কোনো কাজের কথা নয়। ওটাকে দায়িত্ব এড়ানো বলে।" অমনি ময়ূখও কিছু লিখে দেয়। এইভাবে চারদিনের বন্ধ কথা চার মিনিটেই সংলাপে সংলাপে মুখর হয়ে যেত। বারো দিন হয়ে গেল। বৃষ্টিতে পর্দার ওপারে গ্লাস উইন্ডোটা ভিজে কখনো কখনো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মেঘের নিচে তখন শহরের ঘরবাড়ি কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ফোনটা নিয়ে ময়ূখ অহনাকে ফোন করল। প্রথমবার পুরো রিং হয়ে কেটে গেল। আবার করল। কিছুক্ষণ রিং হবার পর অহনা বলল, 
- প্লিজ ময়ূখ। নিজেকে বেশি চালাক ভেবো না। আর নিজেকে বেশি সৎ, সরল ভাবাটাও তোমার একটা চালাকি। আমাকে দু সপ্তাহের মধ্যে একটা উপন্যাস শেষ করতে হবে। রাখছি।
- বিষয় কি?
- সেটা তোমার না জানলেও চলবে। যারা আমার সুহৃদ তাদের ঠিক সময়ে জানিয়ে দেব। তুমি আর ফোন করো না। না হলে ব্লক করতে বাধ্য হবো।

কেটে যাওয়া ফোনটা পাশে নামিয়ে রেখেই একটা সিগারেট ওর ঠোঁটে গিয়ে উঠল। বাইরে থেকে দেখা না গেলেও ওর গোটা শরীরের ভেতর কাঁপছে। ভয়ে নয়, রাগেও নয়। উত্তেজনায়। সে ভেবে পাচ্ছে না সে কী এমন করেছে যার জন্য অহনা এমন রিয়েক্ট করল। সবসময় সে অহনাকেই ভালোবাসে। ভালোবাসার মানুষের সাথে আর যাই হোক চালাকি চলে না। সেটা ময়ূখের থেকে অহনাও হয়তো ভালো বোঝে না। ফেমিনিজম নিয়ে বইটা লেখার পর থেকেই সামান্য কারণেই অহনা প্রচণ্ড তর্ক করে। ময়ূখের ভালো লাগে না। একটা কোম্পানিতে ভালো পদে চাকরি করা ময়ূখের পারফিউমের গন্ধ নিতে উজ্জয়িনী কতবার ওর কাছে কাছে ঘুরেছে। সে মোটেও পাত্তা দেয় নি। বরং ল্যাপটপ অন করে স্ক্রিনে অহনার দিকেই কাজের ফাঁকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

অহনা লেখার টেবিলে বসে মায়ের বানানো কফি মগে চুমুক দিতে দিতে লেখার পাতা থেকে একটা লাইনের পুরোটাই কেটে দিল। তারপর ফোন করে বলল,
- শোন্ রিতম, সময়টা একটু বাড়িয়ে দে না রে। দু সপ্তাহটা বড্ড কম। আর পাঁচ দিন বেশি দে। 
ও প্রান্ত থেকে রিতম বলল, 
- আচ্ছা তাই নাও। তোমার মর্জি। 
- ধুর! কি যে বলিস? 
- বলছি, শোনো না। আজ বিকেলে একবার তোমার কাছে যাবো? বৃষ্টি দিনে তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। 
- সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আসিস। সঙ্গে এক প্যাকেট কিং সাইজ। 
- তার মানে তোমার মা বিকেলে থাকবে না?
- না। ছোটমামা আসবে। ও মাকে নিয়ে মামাবাড়ি যাবে। রাতে আবার দিয়ে যাবে।
ফোন রেখে দিয়ে অহনা লেখায় মন দিল। 

কলিংবেলে চাপ দিতেই কাজের মাসি দরজা খুলে দিল। রিতম সোজা ওপরে উঠে দেখে অহনা বালিশ জড়িয়ে শুয়ে আছে। রিতমকে দেখেই বলল,
- এসেছিস। বোস। 
উঠে বসল অহনা। ও বালিশটা কোলের কাছে নিয়ে দোল খেতে খেতে গল্প শুরু করল। প্রতিবার নুয়ে পড়লেই গলার কাছে টপের বিশাল হাঁ দিয়ে অহনার বুকের ভাঁজ দেখা যাচ্ছে। রিতমের চোখ সেই দিকেই। অহনা বুঝতে পারে। তবুও ভ্রুক্ষেপ করে না। রিতম বেশ কিছুক্ষণ পর বলল,
- তোমার শরীরের গন্ধটা দারুন। কেমন যেন ঘোর লাগা একটা গন্ধ। 
- তোরা ছেলেরা না মেয়ে দেখলেই গন্ধ পাস। কই আমরা তো পাই না।
রিতম বলল,
- কে বলেছে তোমরা পাও না। প্রমাণ চাও?
অহনা কিছুটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
- দে তো দেখি। 
রিতম একটা সিগারেট ধরাল। সামান্য একটু খেয়ে ছাইদানিতে ঘসে দিয়ে ডান হাতের তর্জনি ও মধ্যমা অহনার নাকের কাছে ধরল। অহনা একটু একটু করে মৃদু ঘ্রাণ নিতে নিতে কেমন যেন মোহিত হয়ে গেল। রিতমের হাতটা ঘাড় থেকে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে ওকে আরো কাছে টেনে নিল। রিতমও ওর নাক, ঠোঁট অহনার কানের নিচে, ঘাড়ে, বুকের ভাঁজে ডুবিয়ে মেয়েলি গন্ধে ঘোর হয়ে যেতে থাকল। নরম বিছানায় অসম বয়সী দুজন তখন তুমুল হয়ে উঠেছে। একটু পরেই বাইরে বৃষ্টি থেমে গেল। অল্প রোদ উঠল। আলুথালু অহনা রিতমকে বিছানায় পাশে ফেলে দিয়ে জানালার কাছে গিয়ে সিগারেট ধরাল। 

রাজন কয়েকদিন ধরেই লক্ষ্য করছে ময়ূখ বেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। বেশিরভাগ সময় একা থাকতে চাইছে। রাজন দু একটা বেশি কথা বললেই রেগে আগুন হয়ে উঠছে। অথচ মাসখানেক আগেও ময়ূখ কত হাসিখুশি থাকত তা এই মুহূর্তে রাজন ছাড়া কেউই ভালো জানে না। রাজন বেশি বেতনে অন্য বাড়ির কাজের সুযোগ পেয়েও ময়ূখকে ছেড়ে যায় নি একমাত্র ওর সরলতার জন্যই। যদিও আজকের বিকেলে ময়ূখকে কিছুটা শান্তই দেখল রাজন। কিছুটা উত্তেজনাহীন। কিছুটা উত্তাপহীন। রাজনকে কাজের অছিলায় ভেতরের ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে অহনাকে আবার ফোন করল ময়ূখ।
- হ্যালো, বলছি এখন আশা করি রাগ কমেছে। যদিও রাগের কারণ আমি অনেক চেষ্টা করেও এখনো খুঁজে পাচ্ছি না। উপন্যাসটি কবে থেকে শুরু করলে?
অহনা কিছুটা নিস্তেজ। সিগারেটের ধোঁয়াটা একমুখ জানালার বাইরে পাশের সদ্য বৃষ্টি ভেজা নারকেল গাছটার মাথার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, 
- তোমার ল্যাপটপের স্ক্রীনে এবার থেকে অন্য ছবি রেখো? আর বুক সেলফ থেকেও আমার ছবিটা পারলে সরিয়ে দিও। আমি এখান থেকেই খুশি হবো।
পরিস্থিতি হালকা করতে ময়ূখ বলল,
- সে না হয় করবো। কিন্তু উপন্যাসটি কী বিষয়ের ওপর লিখছো বললে না যে?
- আচ্ছা, আমি যে তোমাকে বলতে চাইছি না, সেটা কি তুমি বুঝতেই চাইছো না? নাকি না বোঝার ভান করছো? 
ময়ূখ ইতস্ততঃ হয়ে বলল,
- হঠাৎ কী হয়ে গেল তোমার? দু সপ্তাহ আগেও তো তুমি এমন ছিলে না?
- ও! তার মানে তুমি বলতে চাও আমার স্বাধীনতা বলে কিছুই থাকবে না? তোমার বশীভূত হয়ে চলতে হবে নাকি?
অহনার গলায় কিছুটা আক্রোশের সুর। রিতম বিছানায় নেতিয়ে পড়ে অহনার দিকে তাকিয়ে আছে। বিরক্তি প্রকাশ করে অহনা ফোন কেটে দিল। 

রাজন কিছুটা লেখাপড়া জানে। অবাঙালি এবং বিশ্বস্ত। সে ময়ূখের ভাবগতি দেখে কিছু একটা সন্দেহ করতে শুরু করেছে। দূর থেকে বিভিন্ন কাজের অছিলায় দেখতে থাকল ময়ূখ কিছু একটা লিখছে। তখনো আকাশে রোদ আছে। তারপর লেখা কাগজটা নিয়ে নিজের ঘরে ড্রয়ারে রেখে বেরিয়ে এসেই বলল,
- কোথায় নিয়ে যাবে বলছিলে। যাবে না?
ময়ূখের কথার ভেতর রাজন সন্দেহ খুঁজে পাচ্ছে। ওকে বুঝতে না দিয়েই বলল,
- ঘরগুলো একটু পরিস্কার করে নিই। তারপর বেরোবো। 
ঘর পরিস্কার করার অছিলায় ওর টেবিলের কাগজগুলি গোছাতে গোছাতে ড্রয়ারটা টেনে সদ্য লিখে রাখা কাগজটি বের করে স্নানের ঘরে ঢুকে গেল। এ তো রীতিমতো সুইসাইড নোট! কাগজের লেখার ওপর বড়ো বড়ো চোখ করে রাজন শুধু অহনার ওপর ময়ূখের অভিমান পড়ে গেল। বেরিয়ে বলল, 
- রেডি হয়ে নাও। এবার বেরোবো।

সেলফ ড্রাইভার ময়ূখের ধূসর কালো চার চাকায় ওর পাশে বসে যেতে যেতেই রাজন ভেবে নিল যেখানে নিয়ে যাবে ভেবেছিল সেখানে যাবে না। যদিও কোথায় যাবে আগের থেকে ময়ূখ কিছুই জানে না। সন্ধে হয়ে এসেছে। একটা শুনশান জায়গায় গাড়িটা দাঁড়াল। রাজন গেট খুলে নেমে হনহন করে হেঁটে গেল। পিছনে ময়ূখ। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সে রাজনের পিছনে হেঁটে চলেছে। একটাও লোক নেই শহরের এই প্রান্তে। মূল রাস্তা থেকে জায়গাটি বেশ কিছুটা দূরে। চারদিকে গোল গ্যালারির মতো। ছোট বৃত্তাকার। নিচে সবুজ মাটি। প্লাস্টার খসে যাওয়া ভেঙে ভেঙে যাওয়া সিঁড়ি দিয়ে রাজন ময়ূখকে ওপরে তুলল। জায়গাটি দেখেই ময়ূখের মনে হল এখান থেকে ঝাঁপ দিলে মৃত্যু সম্পর্কে বিন্দুমাত্রও অনিশ্চয়তা থাকবে না। সে ঝাঁপ দেবার প্রস্তুতি নিতেই রাজন বলল,
- রাজাদের আমলের এটি তৈরি। শুনেছি এখানে অবৈধ সম্পর্কের কারণে কেউ অপরাধী সাব্যস্ত হলে তাদের দাঁড় করিয়ে রাজার পেয়াদা পিছন থেকে ঠেলে দিত। 
কথাটি শুনেই ময়ূখের বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। নিচের দিকে তাকাতেই দেখল, বেশ কয়েকজন তাকে দু হাত তুলে ডাকছে। তারা সবাই যুবক যুবতী। একটা ঘোরের মধ্যে ময়ূখ অন্য সিঁড়ি দিয়ে ওদের কাছে দ্রুত নেমে যেতে থাকল। রাজন বুঝতে পেরেই ওর পিছু নিল। সবুজ মাটিতে এসে ময়ূখ ইতস্ততঃ তাকিয়ে দেখল কেউ কোত্থাও নেই। রাজনকেও যেন দেখতে পেল না। যদিও রাজন তার পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে অদ্ভুত একটা নেশার মতো ঘোর হয়ে মাটিতে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল, গ্যালারির মতো দাঁড়াবার জায়গাটিতে অনেকগুলি অহনা এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে একসাথে সশব্দে হেসে চলেছে। ধীরে ধীরে ঘোলাটে অন্ধকার নেমে এল। মাঠ, ময়ূখ, রাজন এবং সম্পূর্ণ স্থাপত্যটি ঢেকে ফেলতে থাকল।

Wednesday, July 29, 2020

আমাকে নিয়ে চলো, জাহ্নবী



দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

আমার কি কোনো দায় আছে? কেউ বললো, পশু তো আর নয়। অবশ্য তাদেরও দায় থাকে। পতঙ্গ হলেও দায় থাকে। এমনকি সাপ হলেও। অতএব আমিই বা কোন প্রানীটি যে দায় এড়িয়ে বেঁচে থাকি কিমাকার গোলকের উপরিভাগে। এইভাবে কত প্রশ্ন। ক্ষণে ক্ষণে ভুলে যাওয়া। যদিও নির্দিধায় কেটে গেলো পঁয়ত্রিশ বছর। আর দুটো বছর নিশ্চয়ই কেটে যাবে প্রাক্তন বছরের মতোই। বিশেষ কোনো ঋতু নেই আমার। কোনো মেধাবী মাস অথবা উৎসব। কোথায় কখন কে আসে আর ফিরে চলে যায় উত্তর আসে না। মানুষের পদপ্রান্তে কার নিয়তি পড়ে থাকে? মানুষের ছায়া পড়ে থাকে না। আমি বেঁচে আছি এই পরম আশ্চর্যের ভেতর। যথেষ্ট আনন্দ। এরপর কয়েকটি লেখা ক্ষুদ্র জীবনজুড়ে। একটি দুটি প্রেম। কয়েকটি চলে যাওয়া মিছিলের ছায়ার মতোই। দিন ঘুরে চলেছে রাতের পিছনে ন্যাওটা ছেলেটির মতো। খুঁট ধরে প্রতিদিন বলে "ভোর দে"। রাতও বিরক্ত হয় এই প্রাত্যহিক কাঙালপনায়। মেজাজ দেখায়। "আমাকেও সন্ধ্যা দে। দে বলছি।" দুজনেই বেশ আদরে আদরে থাকে। সূর্যবাতি, চন্দ্রবাতি, তারাবাতি তাদের এই নিত্যকার খুনসুটি দেখে অর্বুদ অর্বুদ বছরের পরেও। এর পরেও তুমি চলে যাও। চলে যেতে পারো দায়িত্বে রেখে দিয়ে। কয়েকটি অক্ষর সাজাচ্ছি এভাবেই নিজস্ব সান্নিধ্যে। সাজালাম। দুধের ঘনত্ব থেকে মাখন তুলে নিতে পারলাম না শারীরিক হাতে। অতএব 

আমাকে ভুলিয়ে নিয়ে চলো জাহ্নবী
তোমার চেয়ে কত ছোট। অন্তত বছর ছয়ের তো হবেই
তবুও নিয়ে চলো। নিয়ে চলো দূর দূর 
গ্রাম পেরিয়ে, অরণ্যপথ যেখানে শেষ হয়েছে
সেই গমক্ষেত পেরিয়ে, আরো দীর্ঘ পাহাড়
সমতল পেরিয়ে নদীটির কাছে আমাকে নিয়ে চলো

তুমিই তো বুঝেছো জাহ্নবী, আষাঢ়ে মেঘমাসে
কে আর জানালাবন্দি ঝরঝর আহ্বান করে
কে আর স্যাঁতস্যাতে ঢুলু ঢুলু বিছানায় 
ঘুম চেয়ে রাত্রি নামাতে চায় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে

তুমিই প্রথম জানো, কোথা থেকে চুঁইয়ে পড়ে
মধুবিন্দু। কীভাবে নেমে আসে অমৃতক্ষরণ...

যে নদীর ওপর অবশ্যম্ভাবী মেঘ প্রসব বেদনাহত
সেখানে তোমার আবহমান কোলের ওপর 
আমি শুয়ে থাকবো। জেগে জেগে দেখবো
দিন আর রাত্রি জেনেশুনে একে অপরের জন্য 
জায়গা প্রস্তুত করে। রহস্য রেখে দেয় শব্দহীন সময়ে

তুমি তো কতদিন, কতবার আমাকে একটি
আলোবিন্দুর কাছে নিয়ে গেছো।
উপেক্ষা করেছো প্রচলিত নিয়ম এবং জোড়া জোড়া চোখ
নিয়ন্ত্রিত পৃথিবীর ঘনান্ধকারে দেখিয়েছো 
আকাশগঙ্গার জ্যোতির্ময় পুঞ্জ পুঞ্জ মায়া

নিয়ে চলো, নিয়ে চলো নির্জন উপাসনায় 
মেঘমন্দ্রের আবহসঙ্গীতে...

অপু না হওয়ার আক্ষেপ ও সত্যজিৎ
















দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

ফ্যাকাশে ঘাসের ভেতর বর্ষণঘন দুপুরে আমিও ছুটেছিলাম বাঁশগাছের নিচে কত কতবার। কিশোরবেলা মাখিয়ে দিয়েছি পদ্মপুকুরের পাড়ে। পশ্চিমের তালতলায়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতো পাশের গ্রামে সূর্যটা ডুবে গেলেই। মনে হতো ওই গ্রামেই হয়তো সূর্যকে ওরা রাখে। ওখানেই ওর ঘর আছে। বৈশাখের বিকেলে গ্রামের মাঝখানে পশ্চিমের আকাশে কমলা মেঘ দেখতাম। সেই মেঘ কখনো বয়স্ক কুমিরের মতো। কখনো রাঙা ঘোড়ার মতো। ভয় পেতাম আকাশের দিকে তাকিয়ে। 

একদিন বৃষ্টিফেরত বাবা ভিজতে ভিজতে দাওয়ায় এসে বসল। তখনো ছেঁড়া ছাতা গলে বৃষ্টির বড়ো বড়ো ফোঁটা জামা, কাঁধ, চুল কিছুটা ভিজিয়ে দিয়েছে। সন্ধ্যার বাতাসে বাবা খুব কাঁপছিল। আমি তেলের আলোয় বাবার সেই ঝাঁকড়া চুলভর্তি মুখ দেখেছিলাম। মা একদিন বলেছিল, "সেদিনের জলে ভিজে তোর বাবা যেমন কাঁপছিল, তেমনি একদিন রাতে কাঁপতে কাঁপতে বুড়ি চলে গেল। আমরা বুঝতেও পারি নি ও এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে।" "বুড়ি কে মা? আমাদের ঘরেই থাকতো?" আমার কিশোর মুখের প্রশ্নে উদাসীন মা খড়ের চালার দিকে তাকিয়ে বলেছিল "তোর চেয়ে বছর সাতের বড়ো ছিল বুড়ি। কী যে হয়েছিল। বুঝতেও পারি নি। কোলের মেয়েটা কোলেই মরে গেল।"

আমি ও আমরা কতবার গ্রাম পেরিয়ে, পুকুরের আলপথ পেরিয়ে, মোরামের রাস্তা ধরে চলে গেছি বড়ো সড়কের কাছে। হলদি রোড। তার ওপর বাঁকুড়া থেকে পুরুলিয়ার যাবার বাস যায়। দূর থেকে দাঁড়িয়ে প্রথম দেখেছিলাম অনেকগুলি চাকা  লাগানো গাড়ি কালো পিচের ওপর শনশন শব্দে পেরিয়ে যাচ্ছে। আর দেখার মধ্যে ছিল দক্ষিণের নদীটি। সেই কংসাবতীই আমাদের সম্বল। কালিদাস, নিখিল, বিমলরা নৌকো ছেড়ে দিত মাছের গায়ের মতো রঙের নদীতে। ধূসর জলে জাল ফেলা দেখতে দেখতে কতবার ভুলে গিয়েছি সিঁড়িভাঙা অঙ্ক, সালোকসংশ্লেষের সংজ্ঞা। ভুলে গিয়েছি প্রকৃতি প্রত্যয় অথবা আলাউদ্দিন খিলজির দাক্ষিণাত্য নীতি। বাড়ি ফিরে হ্যরিকেনের আলোয় নৌকোর গল্পে কালিদাস, বিমলরা এসে ভাসতে থাকতো বইয়ের পাতায়। 

বাঁশ গাছের ঝোপ বেড়ে চলে। পুকুর ভরে ওঠে পদ্মপাতায়। আমিও বড়ো হতে থাকি। লাউগাছের আকর্ষের মতোই বড়ো হয়ে যাই প্রত্যয়হীন। আমার বড়ো হওয়ার সমান্তরালে বাবার ঝাঁকড়া চুল কমে আসে। ছোট হতে থাকে। মুখ ভারি হয়। অল্প অল্প মাংস জমে। মায়ের সিঁথির সিঁদুর আরো বেশি লাল টকটকে দেখায় হাতের শ্বেত শাঁখার পাশে পলার মতোই। গ্রামের শেষে সরকারী পাঠাগারের তুঁত আঠার গন্ধ, উইমাটি জাপটানো কাঠের আলমারির মধ্যে 'পথের পাঁচালী' আবিষ্কার করি। সেই প্রথম আমার গ্রাম আবিস্কার। সেই প্রথম বিভূতিভূষণ। কয়েকদিনের মধ্যেই মাটির ঘরে মা তখন সর্বজয়া। বাবা হরিহর। নাপিত পাড়ার প্রশান্তর ঠাকুমাই তো ইন্দির ঠাকরুণ। একে একে মিলে যায় সবকিছুই। মিলে যায় বাঁশ বাগান। পদ্মফুলের পুকুর। গেরস্থের উঠোনে দুপুরের রোদে শুকোতে দেওয়া আচারের কাঁচের বোয়েম। সব সবকিছু। শুধু ছায়া খোঁজা দুপুরে বাসন্তী কাকিমাদের পেয়ারা গাছটি দেখলেই দুর্গাকে মনে পড়ে। জ্যৈষ্ঠের শেষে আকাশে মেঘ হলেও...। মনে পড়ে মা বলেছিল বুড়ি চলে গেছে। 

কলেজের এক বন্ধুর বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে ওদের গ্রামে পরেরদিনও থেকেছিলাম। ওর দিদি আমি আমরা তিনজন পুকুরের পাড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়ালাম। জলের গায়ে কালো কালো পোকারা যেন অস্থির জ্যামিতিক চিত্র এঁকে যেতে থাকলো। পশ্চিমের তালগাছগুলির মাথা টপকে পাশের গ্রামে সূর্য নামল। ওর দিদি ওর হাতটা শক্ত করে ধরে বলেছিল, "এবার ফিরে চল। সাপ বেরোতে পারে।" ওদের পিছনে হেঁটে তিনজনেই ফিরে এসেছিলাম। সেই সন্ধ্যায় আমার বুড়ির কথা খুব মনে পড়েছিল। সেই প্রথম দুর্গাকে অনুভবে পাওয়া। সেই প্রথম নিজেকে অপুর আসনেও। অথচ আমার তো কিছুই নেই। বুকের ভেতর পুড়ে যাচ্ছে সেই সর্পভয়াতুর সন্ধ্যায়। বন্ধুটির গ্রামে। সূর্যটি ডুবে যাওয়ার পরেই। একা আমি বারবার না দেখা বুড়িকেই খুঁজে যেতে থাকি। আমার জন্মের আগেই মরে যাওয়া বুড়িকে। 

বাবা ওর কথা কখনো বলেনি। এতবছর বয়সে একবারের জন্যও বাবার মুখে বলতেও শুনিনি আমার কোনো দিদি ছিল। মা বলেছে কখনো কখনো। বাবারা বোধহয় বেশি শোক পায়। অথবা বেশি পেয়ে শোকে পাথর হয়ে যায়। মায়েরা সেই শোক বলে যেতে পারে। ভাবতে ভাবতে খেয়াল হয়না কিশোরবেলা, যৌবনের প্রথম বর্ষা, প্রথম বসন্ত পেরিয়ে গিয়েছে কতদিন আগেই। নদী নাব্যতা হারিয়ে আরো বেশি ক্ষীণকটি হয়েছে। প্রশান্তর ঠাকুমাও বেশ কয়েক বছর আগেই মারা গিয়েছে। 

বাবার পেনশনের টাকায় একটি ল্যাপটপ কিনেছি। দোতলার ঘরে বসে প্রথমদিনই অবশ্যই সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী দেখে শুভ উদ্বোধন। থাকতে পারছি না। সব মিলে যাচ্ছে। নিশ্চিন্দিপুর, আমার গ্রাম, সিনেমার বোড়াল গ্রাম। তফাৎ তো তেমন নেই। আমাদের গ্রামের কাছে শরতের সকালে কাশবনের ভেতর দিয়ে কয়লার ইঞ্জিনের ট্রেনের যাওয়া দেখা নেই। ওর বদলে আছে বেশ কিছুটা দূরে বড়ো সড়কের ওপর লম্বা লম্বা লরি। সেই কলেজের বন্ধুটিকে ফোন করলাম। শুধু এটুকুই বললাম, "তোর মতো আমারও দিদি ছিল জানিস তো?"  সে ব্যঙ্গের হাসি হাসল। সে এখন ভালো চাকরি করে। কলকাতা থেকে ফোনে ভেসে আসা ওর হাসিতে কেমন যেন একটা অহংকার ঝরে পড়তে লাগল। 

ফোনটা অবহেলায় পালঙ্কে আলতো করে ছুঁড়ে  দিই। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি উত্তরের জানালাটার দিকে। সেখান থেকে ঘন সবুজের ভেতর পদ্মপুকুরটা এখনো দেখা যায়। ল্যাপটপে ইন্টারনেট খুলে নিছক কৌতুহলবশত খুঁজে যেতে থাকি পথের পাঁচালীর চলচ্চিত্রায়নের নির্মাণকথা। খুঁজে পাই বোড়াল গ্রাম। চুনীবালা দেবী, তুলসী চক্রবর্তী ইত্যাদি ইত্যাদি। চোখের সামনে ঈশ্বরের মতো দাঁড়ায় শালপ্রাংশু সত্যজিৎ রায়। আমি থাকতে পারি না। উমা দাশগুপ্তের মুখের সঙ্গে বুড়ির মুখটা মেলানোর চেষ্টা করি। মেলানোর চেষ্টা করি করুণার সঙ্গে মায়ের মুখটাও। মেলে না। মায়ের অধিকাংশ সাদা চুলের মাঝখানে রক্ত নদীর মতো সিঁদুর টকটক করে। আজ বড়োই অভিজ্ঞ লাগে মাকে।

আমি বিছানায় থাকতে পারিনা। নিজেকে অপুর জায়গায় সেই কবে কিশোরকাল থেকে বসাতে বসাতে মাঝে মাঝেই হ্যালুসিনেশন হতে থাকে। ল্যাপটপটা ফট করে বন্ধ করেই ঘর পিছনে ফেলে, উত্তরের জানালা ফেলে দ্রুত এসে দাঁড়াই ছোট্ট পুকুরটির কাছে। তার দক্ষিণ পূর্ব কোণের অশ্বত্থ গাছটির ছায়া তখন জলে পড়ছে না। বরং বিলম্বিত বিকেলের আলতো কমলা মেঘরঙ জলে পড়ছে। পদ্মপাতায় পড়ছে। পোকারা পা ছড়িয়ে ইতস্ততঃ খেলা করছে নিস্তরঙ্গ জলের ওপর। বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠল। পোকাদেরও ঘরবাড়ি আছে। পাতাদেরও সংসার আছে। শুধু আমারই একা বুড়ি নেই।

আষাঢ়ের এই প্রথম বিকেলে হঠাৎ মেঘ কালো হয়ে এলো। একটু পরেই ঝড়ো হাওয়া। সঙ্গে বৃষ্টি। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির ছাঁটে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকলাম একা...। হাওয়া আর ওড়াতে পারছে না ভেজা পাঞ্জাবির আঁচল। সন্ধে হয়ে এলো। কালো হতে থাকা জলে মিলিয়ে যেতে থাকল পোকাদের অস্থিরতা। হঠাৎ ওইপাড়ে দীর্ঘকায় একজনকে হেঁটে যেতে দেখে চেঁচিয়ে উঠলাম, "মানিকবাবু...বৃষ্টিতে বাঁশবাগান ভিজল। পদ্মপাতা ভিজল। আমিও ভিজলাম। আমি কিন্তু অপু হতে পারলাম না মানিকবাবু।" বলতে বলতেই আষাঢ় সন্ধ্যার অন্ধকারে দীর্ঘদেহী লোকটির দিকে এগিয়ে যেতে থাকলাম। লোকটি ততই আমার থেকে দূরে সরে যেতে থাকল। শুধু বৃষ্টি পরবর্তী ঝড়ো হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে গেল, "আমি কিন্তু অপু হতে পারলাম না মানিকবাবু...আমি কিন্তু বুড়ির ভাই হতে পারলাম না...।"

এক ঘর, দশ উঠোন

দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায়  ওপরে উঠতে চাইছি। চাঁদ ঘোলাটে হয়ে গেল মধ্যরাতে।  সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে কৈশোর দেখছি। এখন রাত। যত ওপরের দিকে যাই... ততই কান্না ...