Tuesday, August 11, 2020

আমার সইকথা



দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায় 

"অটোগ্রাফ" শব্দটি কীভাবে জেনেছিলাম আজ আর বলতে পারবো না। হয়তো স্কুল পেরোচ্ছি যখন। তখন আর কতই বয়স। সতেরো অথবা সদ্য নাগরিকের স্বীকৃতি পেতে চলেছি তেমন বয়স। কীভাবে অটোগ্রাফ হয়, কারা দেন, কারা দিতে পারেন সেই সম্বন্ধে কোনো ধারণাই তো ছিলো না সেইসময়। একটু একটু মনে পড়ছে বুক থেকে স্বেচ্ছাসেবকের ব্যাজ খুলে এক যাত্রাশিল্পীর সই নিয়েছিল আমার মামার ছেলে। সেও আমাকে বলেছিল অটোগ্রাফ। তারপর বুঝতে শিখলাম অটোগ্রাফ কী। অটোগ্রাফের খাতাই বা কী। 

২০০৮ সালের ১৭ নভেম্বর (যদি ভুল না বলে থাকি) নন্দনে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের শেষ দিন। আমি উদভ্রান্তের মতো হাতে একটি ডায়েরি নিয়ে ঘুরছি। ঘুরছি অটোগ্রাফের আশায়। গ্রাম থেকে হঠাৎ এবং দ্বিতীয়বার মহানগরে যাওয়া আমি মৃণাল সেনের অটোগ্রাফ চাইতে পিছনে পিছনে গেলাম। উনি একটিও কথা না বলে রাজকীয় মেজাজে ভেতরে ঢুকে গেলেন প্রেক্ষাগৃহের বাদামি দরজার ওপারে। তক্ষুনি আমার ডান কাঁধটা ঝাঁকিয়ে একজন ঘুরিয়ে ওর দিকে আমাকে করে নিল। বলল, "জানো না, উনি অটোগ্রাফ দেন না!" সেই প্রথম কারো কাছে অটোগ্রাফ চাইতে গিয়ে বুঝেছিলাম এটি কী পরিমান পরম বস্তু। 

সরে এলাম যথেষ্ট অবাক হয়ে। কাঁচা মনে ভয়ও ধরেছিল বৈকি! ভেতরে প্রদর্শিত হবে রবীন্দ্রনাথের 'চতুরঙ্গ'। সিনেমার পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায় আমার সামনে দাঁড়িয়ে। পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেন দামিনী চরিত্রের ঋতুপর্ণা। এলেন কবীর সুমন। সেদিনের সন্ধ্যায় দেখেছিলাম রূপোলি পর্দার অনেক সোনালী মানুষ-মানুষীদের। আমার পরিশ্রম বিফলে যায় নি। একে একে অনেকেরই অটোগ্রাফ নিয়েছিলাম সেই হেমন্ত সন্ধ্যায়। হঠাৎ চারিদিকে সাইরেনের আওয়াজ। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রেক্ষাগৃহের দিকে এগিয়ে আসছেন। আমি উদগ্রীব। ওনারও অটোগ্রাফ চাই। পুলিশ আমাকে আটকালো। পিছনে অনেক লোক। আমি ছটফট করছিলাম। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থমকে দাঁড়ালেন। বললেন, "ওদের আসতে দাও।" আমি ও আমরা হুড়মুড়িয়ে ওনার পিছন পিছন প্রেক্ষাগৃহের বাদামি দরজা পর্যন্ত গেলাম। ধবধবে মানুষটি আলো অন্ধকারের ভেতরে ঢুকে গেলেন। আমি অটোগ্রাফ নেবার কথা ভুলেই গিয়েছি তখন।

কলেজবেলা থেকেই একটু বড়ো হচ্ছি ক্রমে ক্রমে। কতদিন বিভিন্নভাবে নিজের সই করে খাতার পিছন ভরিয়েছি। যদি কেউ আমারও অটোগ্রাফ নেয়! যদি কখনো আমিও দেবার যোগ্যতা পাই। যোগ্যতম হয়ে উঠতে পারি। সেই ভেবে কত দিন, কত কাল শুধু খাতার পিছন ভরিয়ে ভরিয়ে গোপনে নিজেকে প্রশ্রয় দিয়ে গেছি। পালন করতে পারিনি। বুঝেছি, প্রশ্রয় দেওয়া আর পালন করা এক জিনিস নয়। আজও অটোগ্রাফ দেওয়ার যোগ্যতমের কাছাকাছি অবস্থানও আমার একজীবনে কখনোই সম্ভব নয়। তাই সময়ের সান্নিধ্যে সেইসব খাতার দেওয়ালে ধুসর ধুসর শ্যাওলা। বিবর্ণ এবং স্থায়ীভাবেই উধাও। 

২০১৫ সালে বাঁকুড়া বইমেলায় যখন আমার প্রথম কবিতার বই বেরোলো 'হৃদি ডুবে যায়', নাম ভুলে যাওয়া এক নবীনকিশোর, যাকে ভুবনডাঙার একলা আকাশ, মেঘলা আকাশ কিছুই দিতে পারিনি। বইটি নিয়ে সে শুধু বলেছিলো, "একটি সই করে দাও।" আমি উত্তেজনায় শুধু নামটুকুই কোনোমতে লিখে দিতে পেরেছিলাম। বুঝেছিলাম, দিনের পর দিন খাতার পিছনে সই করার পরিশ্রম বিফলেই গেছে। যে যত্নে সেদিন নিজের নামটি এক থেকে অজস্রবার লিখবার চেষ্টা করতাম, আজ আর তা পারলাম কই? 

এখনো পারিনি। পারিনা। শুধু সময়, আমি তোমার কাছে জীবন রাখলাম। যা দেখলাম, তাই লিখছি। যা বুঝলাম, তাই বলছি। শুধু সময়, আমি তোমার কাছে জীবন বেঁধে রাখি। 

2 comments:

  1. এত সুন্দর গদ্যটি কারুর পড়ার সময় হয়নি কেন আমি জানিনা এবং গদ্যটি শেষে আমি প্রথম কমেন্ট করতে পেরে ভালো লাগছে এই ভেবে যে প্রায় সকলেরই কিশোর এবং যৌবন বয়সের সন্ধিক্ষণ এমনভাবেই নক্ষত্রের অন্বেষণে কেটেছে। আমরা প্রায় সকলেই আমাদের হৃদয় আসনের প্রতিষ্ঠিত রাজার মতো ডায়রির শেষ পাতা অন্তহীন স্বাক্ষর লিখে যাই। কিন্তু যখন সত্যকারের দেবার সময় আসে কি এক আবেশে অথবা এক অস্পষ্ট চাপা আনন্দে এবং কুয়াশাচ্ছন্ন আনকোরা স্টারডমে আমরা স্রোতের মুখে খড়কুটোর মতো আবেগে ভেসে যায়।

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমি মুগ্ধ হয়েছি আপনার মন্তব্যে

      Delete

এক ঘর, দশ উঠোন

দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায়  ওপরে উঠতে চাইছি। চাঁদ ঘোলাটে হয়ে গেল মধ্যরাতে।  সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে কৈশোর দেখছি। এখন রাত। যত ওপরের দিকে যাই... ততই কান্না ...