দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায়
লম্বা লেন্সওয়ালা ক্যামেরা নিয়ে আমিও অনেকবার চলে গেছি রাঙামেটিয়ার জঙ্গলে, কংসাবতীর তীরে, মুকুটমণিপুরের ছলাৎ ছল জলের কাছে। গ্রীষ্মের দহনবেলায় তখন আমার চৈতন্য মগ্ন হয়েছিল ফড়িংয়ের গায়ে, দুধরাজের লেজে নয়তো নৌকোর ডোগায়। মাথার ওপর রোদের শামিয়ানা। নিচে শরীর। খাঁ খাঁ বেলাভূমিতে কচুরিপানা পাতার ওপর একটি রক্তিম ফড়িং। লেন্স তাক করে রইলাম। ওর বড়োই অস্থিরতা। ফিরতে ফিরতে সেই দুপুর।
প্রচন্ড গরমে ছটফট করছে বোন। তলপেটে ব্যথা। কুঁকড়ে যাচ্ছে মাঝেমাঝেই। আমি শুধুই তাকিয়ে আছি অসহায় দুটি চোখে। বাবা পাশে বসে। মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে পেটে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আমি নিরুপায়। গাড়ি ডাকার জন্য ফোন বের করছি অমনি কষ্ট করেই বোন বলল, "গাড়ি ডাকতে হবে না রে দাদা। একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে।" আমি মাকে রান্নাঘরে, বাবাকে স্নানে পাঠিয়ে বোনের কাছে চুপ করে বসে রইলাম। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দিতে বলল, " ব্যাথাটা একটু কমছে। পাশে তাকিয়ে দ্যাখ্, কী করেছি।" পালঙ্কের নরমে একদিকে তখন পড়ে রয়েছে ওর ছুঁচ আর সুতো। সুতির কাপড়ের ওপর অসমাপ্ত নিপুন নকশাটি। ব্যাথা ছেড়ে উঠে গেলেই আবার কাপড়ে নকশা তুলবে। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ নিজের ভেতর ওকে ঢুকিয়ে রেখে বলি সব ব্যথা আমার...আমার...
অনির্বাণ তখন বিষ্ণুপুরে। তার ক্যামেরার লেন্সে একে একে ধরা পড়ছে মল্ল রাজাদের আশ্চর্য স্থাপত্য কীর্তি। জোড়বাংলা, রাসমঞ্চ, গড়দরজা কত কী। হঠাৎ পেটের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া ছেলেটা বসে পড়েছে লাল মাটির ওপর। হাত থেকে ক্যামেরাটা কোনোমতে নামিয়ে রেখেছে মাটিতে। কেউ কোত্থাও নেই। জানেই না পেটে ব্যথা হলে কেমন লাগে। প্রথম ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটা ছোট হয়ে যায়। আমি পরে সব জানতে পারি। ওকে বোনের মতো করে জড়িয়ে ধরে নিজের ভেতর রাখতে পারি না। বলতে পারি না সব ব্যথা আমার...আমার...। সে তো আমার কাছে থাকে না। ভাবতে বসি কেন এত ব্যথা শুধু পেটের ভেতর?
ব্যথা কমে যায় ওকে কৃপা করে। আবার ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে সে ক্লিক করতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে পঞ্চরত্ন মন্দিরের চূড়ো। রাতের অন্ধকার নেমে এলে তুঁত রঙের গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে পেরিয়ে পেরিয়ে আসে নাকাইজুড়ির জঙ্গল, ছাগুলিয়ার গ্রামপথ, জয়পণ্ডা নদীর সেতু, নিজের গলির ভেতর। ডান হাতের আমগাছটা এক বুক অভিমানে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন সে অনির্বাণের প্রবেশ প্রস্থানের প্রতিক্রিয়াহীন সাক্ষী থেকে যায়। অনির্বাণ কি আদৌ বুঝতে পারে একা আমগাছের আন্তরিক অভিমান?
আমি ওর কাছে চলে যাই কোনো কোনো দিন খেয়ালবশে। তখন একদিনও ওর ব্যথা হয় না। ওকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ দেয় না। অথচ মাঝে মাঝেই ওর ব্যথা জন্মে। পাকস্থলীর ওপরে যে আয়না, সেখানে গভীর ক্ষত আছে। তার দায় নিতে হচ্ছে নিচের অংশকে। আমি খবর পাই। ফোনে জানতে পারি ওর ব্যথার ইতিহাস। শুশ্রূষার নিয়ম। অথচ ছুঁয়ে থাকতে পারি না। প্রচন্ড রোদ দিচ্ছে। আকাশ থেকে যেন আগুনবৃষ্টি হচ্ছে। একজন ব্যথা পেটে কাপড়ে সুদৃশ্য ফুল তোলে, জ্যোৎস্নার জল আঁকে। আরেকজন লেন্সে বন্দি করে গ্রীষ্মের বালুচরির আঁচল, প্রজাপতির জন্মবৃত্তান্ত।
একদিন প্রচণ্ড দুপুর। একটা বই পড়তে পড়তে হঠাৎ দুজনের কথা মনে পড়ে গেল। দুজনের ব্যথার কথা। কীভাবে পেটের মোচড় ওদের সাময়িক জখম করে পরমুহূর্তেই সৃজনের কাছে পৌঁছায়? প্রশ্নচিহ্ন সঙ্গে নিয়েই ঘর থেকে উত্তরে সাহেববাঁধের দিকে হেঁটে গেলাম। সঙ্গে ক্যামেরা। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম ঠা ঠা রোদের নিচে। শুকনো ঘাসে এসে প্রজাপতি ডানা মেললো না। আকাশ কালো করে মেঘ এলো না। একলা রোদের দুপুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলাম, "ব্যথা দাও...ব্যথা দাও...আমিও কাঁথা স্টিচের ফুল আঁকতে চাই। আমিও প্রজাপতির জীবনচক্র ধরে রাখতে চাই।" আমার চিৎকার রোদের তীব্রতায় একটু একটু করে ঝলসে যেতে থাকলো। মিলিয়ে যেতে থাকল আগুনবেলার দহনদিনে। তবু আমার জন্য পেটের ভেতর মোচড় দেওয়া কোনও ব্যথা এলো না।

No comments:
Post a Comment