দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায়
এই তো কিছুক্ষণ হলো ময়ূখ নেট অফ করে জানালার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি। কখনো টিপ্ টিপ্। মানিপ্ল্যান্টের কাঁচা পাতাগুলো এই বর্ষায় আরো সবুজ দেখাচ্ছে। সোফায় বসে থাকা ময়ূখের চোখে তখন আষাঢ়ের থৈ থৈ। কোথায় যাওয়া যায় এখন? ভাবছে শহর ছাড়িয়ে ব্যাণ্ডেলের দিকটা একবার ঘুরে আসা যাক। আবার চোখ ফেরায় বুক সেলফটার দিকে। ফ্ল্যাটটার ইন্টিরিয়র ডিজাইন চমৎকার। ডিজাইনার সমঝদার লোক মানতেই হবে। সলমন রুশদির বইয়ের পাশেই অহনার ছবিটা ওর দিকে তাকিয়ে।
- রাজনদা একটু চা করো তো?
বসে থেকেই কাজের লোক রাজনকে হাঁক দিল। তারপরেই একটা বাংলা পত্রিকার পাতা ওল্টাতে থাকল। সাহিত্য নির্ভর পত্রিকা। তবুও দেশ, কাল, সমসময় নিয়ে সম্পাদক খুবই সচেতন। পাতায় পাতায় তারই ছাপ রেখেছে। ভেতরে বিভিন্ন কবির একগুচ্ছ কবিতা। ফাঁকে ফাঁকে নীল, হলুদ প্যাস্টেলের ইলাস্ট্রেশন। ময়ূখ কবিতায় চোখ আটকে একটা সিগারেট ধরাল। রাজন চা এনে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
- দাদা, আজ খিচুড়ি করলে কেমন হয়? এই আবহাওয়ায় খেতে ভালোই লাগবে। গত কালকের চিকেনটা একটু ফ্রিজে রাখা আছে। কষে দিলে মন্দ হতো না।
- তাই করো। ভেবেছিলাম একটু বেরোব। একা একা বোরিং লাগছে। কিন্তু যাবোই কোথায়? জল কাদায় সব জায়গায় তো একই অবস্থা।
রাজন বলল,
- বিকেলে বৃষ্টি থেমে গেলে তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবো। যেখানে তুমি কখনো যাও নি।
- কোথায় সেটা?
- এই শহরেই। তুমি যাও নি। আমি এই শহরের লোক কি না। তাই জানি। সে গেলেই বুঝতে পারবে।
রাজন চলে যেতেই ময়ূখ আবার কবিতায় চোখ রাখল। আজ তার অফিস ছুটি। কিছুই ভালো লাগছে না তার। কারণ অহনা হঠাৎ করেই ব্রেক আপ করে দেবে ভাবতেই পারে নি। সেলিব্রিটি হওয়ার যে কি জ্বালা তা এতদিনে হাড়ে হাড়ে ময়ূখ টের পাচ্ছে। আসলে এবারের বইমেলায় অহনার ফেমিনিজম নিয়ে লেখা বইটা বেস্ট সেলার হয়েছে। দু মাসেই তৃতীয় সংস্করণ শেষ। বইয়ের পাতায় অটোগ্রাফ দিতে দিতে আঙুলে ব্যথা ধরে যাওয়ার জোগাড়। সেই থেকেই অহনার কেমন যেন একটু গা ছাড়া ভাব। অথচ একসময় ময়ূখ ছাড়া অহনা নির্ভরযোগ্য দ্বিতীয় কাউকেই ভাবতে পারেনি। ময়ূখকে ক্যাফেটেরিয়ায় কফি খেতে খেতে এক বসন্তের বিকেলে অহনা বলেছিল,
- তোমার মতো যদি কবিতা লিখতে পারতাম! তবে দেখো, প্রথমবার আমাদের ছেলেই হবে।
ময়ূখ মাথা নেড়ে বলেছিল,
- আমি রবি ঠাকুরের কাছে মানত করেছি যেন মেয়ে হয়। নাম দেব কৃষ্ণকলি।
অহনার মুখে গোধূলি আলো পড়ে গালের ওপর ফুটে ওঠা নীল শিরাগুলি আশ্চর্য দেখাচ্ছিল। শিল্পীর আঁকার চেয়েও আশ্চর্য!
বারো দিন ওদের কোনো কথোপকথন নেই। যদিও কথাবার্তা বন্ধ এর আগেও অনেকবার হয়েছে। তবে সেটা বেশি হলে চারদিন। চারদিন পেরিয়ে গেলে অহনাই হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ দিয়ে বলে, "কথা না বলে থাকাটা কোনো কাজের কথা নয়। ওটাকে দায়িত্ব এড়ানো বলে।" অমনি ময়ূখও কিছু লিখে দেয়। এইভাবে চারদিনের বন্ধ কথা চার মিনিটেই সংলাপে সংলাপে মুখর হয়ে যেত। বারো দিন হয়ে গেল। বৃষ্টিতে পর্দার ওপারে গ্লাস উইন্ডোটা ভিজে কখনো কখনো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মেঘের নিচে তখন শহরের ঘরবাড়ি কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ফোনটা নিয়ে ময়ূখ অহনাকে ফোন করল। প্রথমবার পুরো রিং হয়ে কেটে গেল। আবার করল। কিছুক্ষণ রিং হবার পর অহনা বলল,
- প্লিজ ময়ূখ। নিজেকে বেশি চালাক ভেবো না। আর নিজেকে বেশি সৎ, সরল ভাবাটাও তোমার একটা চালাকি। আমাকে দু সপ্তাহের মধ্যে একটা উপন্যাস শেষ করতে হবে। রাখছি।
- বিষয় কি?
- সেটা তোমার না জানলেও চলবে। যারা আমার সুহৃদ তাদের ঠিক সময়ে জানিয়ে দেব। তুমি আর ফোন করো না। না হলে ব্লক করতে বাধ্য হবো।
কেটে যাওয়া ফোনটা পাশে নামিয়ে রেখেই একটা সিগারেট ওর ঠোঁটে গিয়ে উঠল। বাইরে থেকে দেখা না গেলেও ওর গোটা শরীরের ভেতর কাঁপছে। ভয়ে নয়, রাগেও নয়। উত্তেজনায়। সে ভেবে পাচ্ছে না সে কী এমন করেছে যার জন্য অহনা এমন রিয়েক্ট করল। সবসময় সে অহনাকেই ভালোবাসে। ভালোবাসার মানুষের সাথে আর যাই হোক চালাকি চলে না। সেটা ময়ূখের থেকে অহনাও হয়তো ভালো বোঝে না। ফেমিনিজম নিয়ে বইটা লেখার পর থেকেই সামান্য কারণেই অহনা প্রচণ্ড তর্ক করে। ময়ূখের ভালো লাগে না। একটা কোম্পানিতে ভালো পদে চাকরি করা ময়ূখের পারফিউমের গন্ধ নিতে উজ্জয়িনী কতবার ওর কাছে কাছে ঘুরেছে। সে মোটেও পাত্তা দেয় নি। বরং ল্যাপটপ অন করে স্ক্রিনে অহনার দিকেই কাজের ফাঁকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
অহনা লেখার টেবিলে বসে মায়ের বানানো কফি মগে চুমুক দিতে দিতে লেখার পাতা থেকে একটা লাইনের পুরোটাই কেটে দিল। তারপর ফোন করে বলল,
- শোন্ রিতম, সময়টা একটু বাড়িয়ে দে না রে। দু সপ্তাহটা বড্ড কম। আর পাঁচ দিন বেশি দে।
ও প্রান্ত থেকে রিতম বলল,
- আচ্ছা তাই নাও। তোমার মর্জি।
- ধুর! কি যে বলিস?
- বলছি, শোনো না। আজ বিকেলে একবার তোমার কাছে যাবো? বৃষ্টি দিনে তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।
- সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আসিস। সঙ্গে এক প্যাকেট কিং সাইজ।
- তার মানে তোমার মা বিকেলে থাকবে না?
- না। ছোটমামা আসবে। ও মাকে নিয়ে মামাবাড়ি যাবে। রাতে আবার দিয়ে যাবে।
ফোন রেখে দিয়ে অহনা লেখায় মন দিল।
কলিংবেলে চাপ দিতেই কাজের মাসি দরজা খুলে দিল। রিতম সোজা ওপরে উঠে দেখে অহনা বালিশ জড়িয়ে শুয়ে আছে। রিতমকে দেখেই বলল,
- এসেছিস। বোস।
উঠে বসল অহনা। ও বালিশটা কোলের কাছে নিয়ে দোল খেতে খেতে গল্প শুরু করল। প্রতিবার নুয়ে পড়লেই গলার কাছে টপের বিশাল হাঁ দিয়ে অহনার বুকের ভাঁজ দেখা যাচ্ছে। রিতমের চোখ সেই দিকেই। অহনা বুঝতে পারে। তবুও ভ্রুক্ষেপ করে না। রিতম বেশ কিছুক্ষণ পর বলল,
- তোমার শরীরের গন্ধটা দারুন। কেমন যেন ঘোর লাগা একটা গন্ধ।
- তোরা ছেলেরা না মেয়ে দেখলেই গন্ধ পাস। কই আমরা তো পাই না।
রিতম বলল,
- কে বলেছে তোমরা পাও না। প্রমাণ চাও?
অহনা কিছুটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
- দে তো দেখি।
রিতম একটা সিগারেট ধরাল। সামান্য একটু খেয়ে ছাইদানিতে ঘসে দিয়ে ডান হাতের তর্জনি ও মধ্যমা অহনার নাকের কাছে ধরল। অহনা একটু একটু করে মৃদু ঘ্রাণ নিতে নিতে কেমন যেন মোহিত হয়ে গেল। রিতমের হাতটা ঘাড় থেকে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে ওকে আরো কাছে টেনে নিল। রিতমও ওর নাক, ঠোঁট অহনার কানের নিচে, ঘাড়ে, বুকের ভাঁজে ডুবিয়ে মেয়েলি গন্ধে ঘোর হয়ে যেতে থাকল। নরম বিছানায় অসম বয়সী দুজন তখন তুমুল হয়ে উঠেছে। একটু পরেই বাইরে বৃষ্টি থেমে গেল। অল্প রোদ উঠল। আলুথালু অহনা রিতমকে বিছানায় পাশে ফেলে দিয়ে জানালার কাছে গিয়ে সিগারেট ধরাল।
রাজন কয়েকদিন ধরেই লক্ষ্য করছে ময়ূখ বেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। বেশিরভাগ সময় একা থাকতে চাইছে। রাজন দু একটা বেশি কথা বললেই রেগে আগুন হয়ে উঠছে। অথচ মাসখানেক আগেও ময়ূখ কত হাসিখুশি থাকত তা এই মুহূর্তে রাজন ছাড়া কেউই ভালো জানে না। রাজন বেশি বেতনে অন্য বাড়ির কাজের সুযোগ পেয়েও ময়ূখকে ছেড়ে যায় নি একমাত্র ওর সরলতার জন্যই। যদিও আজকের বিকেলে ময়ূখকে কিছুটা শান্তই দেখল রাজন। কিছুটা উত্তেজনাহীন। কিছুটা উত্তাপহীন। রাজনকে কাজের অছিলায় ভেতরের ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে অহনাকে আবার ফোন করল ময়ূখ।
- হ্যালো, বলছি এখন আশা করি রাগ কমেছে। যদিও রাগের কারণ আমি অনেক চেষ্টা করেও এখনো খুঁজে পাচ্ছি না। উপন্যাসটি কবে থেকে শুরু করলে?
অহনা কিছুটা নিস্তেজ। সিগারেটের ধোঁয়াটা একমুখ জানালার বাইরে পাশের সদ্য বৃষ্টি ভেজা নারকেল গাছটার মাথার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
- তোমার ল্যাপটপের স্ক্রীনে এবার থেকে অন্য ছবি রেখো? আর বুক সেলফ থেকেও আমার ছবিটা পারলে সরিয়ে দিও। আমি এখান থেকেই খুশি হবো।
পরিস্থিতি হালকা করতে ময়ূখ বলল,
- সে না হয় করবো। কিন্তু উপন্যাসটি কী বিষয়ের ওপর লিখছো বললে না যে?
- আচ্ছা, আমি যে তোমাকে বলতে চাইছি না, সেটা কি তুমি বুঝতেই চাইছো না? নাকি না বোঝার ভান করছো?
ময়ূখ ইতস্ততঃ হয়ে বলল,
- হঠাৎ কী হয়ে গেল তোমার? দু সপ্তাহ আগেও তো তুমি এমন ছিলে না?
- ও! তার মানে তুমি বলতে চাও আমার স্বাধীনতা বলে কিছুই থাকবে না? তোমার বশীভূত হয়ে চলতে হবে নাকি?
অহনার গলায় কিছুটা আক্রোশের সুর। রিতম বিছানায় নেতিয়ে পড়ে অহনার দিকে তাকিয়ে আছে। বিরক্তি প্রকাশ করে অহনা ফোন কেটে দিল।
রাজন কিছুটা লেখাপড়া জানে। অবাঙালি এবং বিশ্বস্ত। সে ময়ূখের ভাবগতি দেখে কিছু একটা সন্দেহ করতে শুরু করেছে। দূর থেকে বিভিন্ন কাজের অছিলায় দেখতে থাকল ময়ূখ কিছু একটা লিখছে। তখনো আকাশে রোদ আছে। তারপর লেখা কাগজটা নিয়ে নিজের ঘরে ড্রয়ারে রেখে বেরিয়ে এসেই বলল,
- কোথায় নিয়ে যাবে বলছিলে। যাবে না?
ময়ূখের কথার ভেতর রাজন সন্দেহ খুঁজে পাচ্ছে। ওকে বুঝতে না দিয়েই বলল,
- ঘরগুলো একটু পরিস্কার করে নিই। তারপর বেরোবো।
ঘর পরিস্কার করার অছিলায় ওর টেবিলের কাগজগুলি গোছাতে গোছাতে ড্রয়ারটা টেনে সদ্য লিখে রাখা কাগজটি বের করে স্নানের ঘরে ঢুকে গেল। এ তো রীতিমতো সুইসাইড নোট! কাগজের লেখার ওপর বড়ো বড়ো চোখ করে রাজন শুধু অহনার ওপর ময়ূখের অভিমান পড়ে গেল। বেরিয়ে বলল,
- রেডি হয়ে নাও। এবার বেরোবো।
সেলফ ড্রাইভার ময়ূখের ধূসর কালো চার চাকায় ওর পাশে বসে যেতে যেতেই রাজন ভেবে নিল যেখানে নিয়ে যাবে ভেবেছিল সেখানে যাবে না। যদিও কোথায় যাবে আগের থেকে ময়ূখ কিছুই জানে না। সন্ধে হয়ে এসেছে। একটা শুনশান জায়গায় গাড়িটা দাঁড়াল। রাজন গেট খুলে নেমে হনহন করে হেঁটে গেল। পিছনে ময়ূখ। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সে রাজনের পিছনে হেঁটে চলেছে। একটাও লোক নেই শহরের এই প্রান্তে। মূল রাস্তা থেকে জায়গাটি বেশ কিছুটা দূরে। চারদিকে গোল গ্যালারির মতো। ছোট বৃত্তাকার। নিচে সবুজ মাটি। প্লাস্টার খসে যাওয়া ভেঙে ভেঙে যাওয়া সিঁড়ি দিয়ে রাজন ময়ূখকে ওপরে তুলল। জায়গাটি দেখেই ময়ূখের মনে হল এখান থেকে ঝাঁপ দিলে মৃত্যু সম্পর্কে বিন্দুমাত্রও অনিশ্চয়তা থাকবে না। সে ঝাঁপ দেবার প্রস্তুতি নিতেই রাজন বলল,
- রাজাদের আমলের এটি তৈরি। শুনেছি এখানে অবৈধ সম্পর্কের কারণে কেউ অপরাধী সাব্যস্ত হলে তাদের দাঁড় করিয়ে রাজার পেয়াদা পিছন থেকে ঠেলে দিত।
কথাটি শুনেই ময়ূখের বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। নিচের দিকে তাকাতেই দেখল, বেশ কয়েকজন তাকে দু হাত তুলে ডাকছে। তারা সবাই যুবক যুবতী। একটা ঘোরের মধ্যে ময়ূখ অন্য সিঁড়ি দিয়ে ওদের কাছে দ্রুত নেমে যেতে থাকল। রাজন বুঝতে পেরেই ওর পিছু নিল। সবুজ মাটিতে এসে ময়ূখ ইতস্ততঃ তাকিয়ে দেখল কেউ কোত্থাও নেই। রাজনকেও যেন দেখতে পেল না। যদিও রাজন তার পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে অদ্ভুত একটা নেশার মতো ঘোর হয়ে মাটিতে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল, গ্যালারির মতো দাঁড়াবার জায়গাটিতে অনেকগুলি অহনা এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে একসাথে সশব্দে হেসে চলেছে। ধীরে ধীরে ঘোলাটে অন্ধকার নেমে এল। মাঠ, ময়ূখ, রাজন এবং সম্পূর্ণ স্থাপত্যটি ঢেকে ফেলতে থাকল।

No comments:
Post a Comment