দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায়
ফ্যাকাশে ঘাসের ভেতর বর্ষণঘন দুপুরে আমিও ছুটেছিলাম বাঁশগাছের নিচে কত কতবার। কিশোরবেলা মাখিয়ে দিয়েছি পদ্মপুকুরের পাড়ে। পশ্চিমের তালতলায়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতো পাশের গ্রামে সূর্যটা ডুবে গেলেই। মনে হতো ওই গ্রামেই হয়তো সূর্যকে ওরা রাখে। ওখানেই ওর ঘর আছে। বৈশাখের বিকেলে গ্রামের মাঝখানে পশ্চিমের আকাশে কমলা মেঘ দেখতাম। সেই মেঘ কখনো বয়স্ক কুমিরের মতো। কখনো রাঙা ঘোড়ার মতো। ভয় পেতাম আকাশের দিকে তাকিয়ে।
একদিন বৃষ্টিফেরত বাবা ভিজতে ভিজতে দাওয়ায় এসে বসল। তখনো ছেঁড়া ছাতা গলে বৃষ্টির বড়ো বড়ো ফোঁটা জামা, কাঁধ, চুল কিছুটা ভিজিয়ে দিয়েছে। সন্ধ্যার বাতাসে বাবা খুব কাঁপছিল। আমি তেলের আলোয় বাবার সেই ঝাঁকড়া চুলভর্তি মুখ দেখেছিলাম। মা একদিন বলেছিল, "সেদিনের জলে ভিজে তোর বাবা যেমন কাঁপছিল, তেমনি একদিন রাতে কাঁপতে কাঁপতে বুড়ি চলে গেল। আমরা বুঝতেও পারি নি ও এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে।" "বুড়ি কে মা? আমাদের ঘরেই থাকতো?" আমার কিশোর মুখের প্রশ্নে উদাসীন মা খড়ের চালার দিকে তাকিয়ে বলেছিল "তোর চেয়ে বছর সাতের বড়ো ছিল বুড়ি। কী যে হয়েছিল। বুঝতেও পারি নি। কোলের মেয়েটা কোলেই মরে গেল।"
আমি ও আমরা কতবার গ্রাম পেরিয়ে, পুকুরের আলপথ পেরিয়ে, মোরামের রাস্তা ধরে চলে গেছি বড়ো সড়কের কাছে। হলদি রোড। তার ওপর বাঁকুড়া থেকে পুরুলিয়ার যাবার বাস যায়। দূর থেকে দাঁড়িয়ে প্রথম দেখেছিলাম অনেকগুলি চাকা লাগানো গাড়ি কালো পিচের ওপর শনশন শব্দে পেরিয়ে যাচ্ছে। আর দেখার মধ্যে ছিল দক্ষিণের নদীটি। সেই কংসাবতীই আমাদের সম্বল। কালিদাস, নিখিল, বিমলরা নৌকো ছেড়ে দিত মাছের গায়ের মতো রঙের নদীতে। ধূসর জলে জাল ফেলা দেখতে দেখতে কতবার ভুলে গিয়েছি সিঁড়িভাঙা অঙ্ক, সালোকসংশ্লেষের সংজ্ঞা। ভুলে গিয়েছি প্রকৃতি প্রত্যয় অথবা আলাউদ্দিন খিলজির দাক্ষিণাত্য নীতি। বাড়ি ফিরে হ্যরিকেনের আলোয় নৌকোর গল্পে কালিদাস, বিমলরা এসে ভাসতে থাকতো বইয়ের পাতায়।
বাঁশ গাছের ঝোপ বেড়ে চলে। পুকুর ভরে ওঠে পদ্মপাতায়। আমিও বড়ো হতে থাকি। লাউগাছের আকর্ষের মতোই বড়ো হয়ে যাই প্রত্যয়হীন। আমার বড়ো হওয়ার সমান্তরালে বাবার ঝাঁকড়া চুল কমে আসে। ছোট হতে থাকে। মুখ ভারি হয়। অল্প অল্প মাংস জমে। মায়ের সিঁথির সিঁদুর আরো বেশি লাল টকটকে দেখায় হাতের শ্বেত শাঁখার পাশে পলার মতোই। গ্রামের শেষে সরকারী পাঠাগারের তুঁত আঠার গন্ধ, উইমাটি জাপটানো কাঠের আলমারির মধ্যে 'পথের পাঁচালী' আবিষ্কার করি। সেই প্রথম আমার গ্রাম আবিস্কার। সেই প্রথম বিভূতিভূষণ। কয়েকদিনের মধ্যেই মাটির ঘরে মা তখন সর্বজয়া। বাবা হরিহর। নাপিত পাড়ার প্রশান্তর ঠাকুমাই তো ইন্দির ঠাকরুণ। একে একে মিলে যায় সবকিছুই। মিলে যায় বাঁশ বাগান। পদ্মফুলের পুকুর। গেরস্থের উঠোনে দুপুরের রোদে শুকোতে দেওয়া আচারের কাঁচের বোয়েম। সব সবকিছু। শুধু ছায়া খোঁজা দুপুরে বাসন্তী কাকিমাদের পেয়ারা গাছটি দেখলেই দুর্গাকে মনে পড়ে। জ্যৈষ্ঠের শেষে আকাশে মেঘ হলেও...। মনে পড়ে মা বলেছিল বুড়ি চলে গেছে।
কলেজের এক বন্ধুর বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে ওদের গ্রামে পরেরদিনও থেকেছিলাম। ওর দিদি আমি আমরা তিনজন পুকুরের পাড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়ালাম। জলের গায়ে কালো কালো পোকারা যেন অস্থির জ্যামিতিক চিত্র এঁকে যেতে থাকলো। পশ্চিমের তালগাছগুলির মাথা টপকে পাশের গ্রামে সূর্য নামল। ওর দিদি ওর হাতটা শক্ত করে ধরে বলেছিল, "এবার ফিরে চল। সাপ বেরোতে পারে।" ওদের পিছনে হেঁটে তিনজনেই ফিরে এসেছিলাম। সেই সন্ধ্যায় আমার বুড়ির কথা খুব মনে পড়েছিল। সেই প্রথম দুর্গাকে অনুভবে পাওয়া। সেই প্রথম নিজেকে অপুর আসনেও। অথচ আমার তো কিছুই নেই। বুকের ভেতর পুড়ে যাচ্ছে সেই সর্পভয়াতুর সন্ধ্যায়। বন্ধুটির গ্রামে। সূর্যটি ডুবে যাওয়ার পরেই। একা আমি বারবার না দেখা বুড়িকেই খুঁজে যেতে থাকি। আমার জন্মের আগেই মরে যাওয়া বুড়িকে।
বাবা ওর কথা কখনো বলেনি। এতবছর বয়সে একবারের জন্যও বাবার মুখে বলতেও শুনিনি আমার কোনো দিদি ছিল। মা বলেছে কখনো কখনো। বাবারা বোধহয় বেশি শোক পায়। অথবা বেশি পেয়ে শোকে পাথর হয়ে যায়। মায়েরা সেই শোক বলে যেতে পারে। ভাবতে ভাবতে খেয়াল হয়না কিশোরবেলা, যৌবনের প্রথম বর্ষা, প্রথম বসন্ত পেরিয়ে গিয়েছে কতদিন আগেই। নদী নাব্যতা হারিয়ে আরো বেশি ক্ষীণকটি হয়েছে। প্রশান্তর ঠাকুমাও বেশ কয়েক বছর আগেই মারা গিয়েছে।
বাবার পেনশনের টাকায় একটি ল্যাপটপ কিনেছি। দোতলার ঘরে বসে প্রথমদিনই অবশ্যই সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী দেখে শুভ উদ্বোধন। থাকতে পারছি না। সব মিলে যাচ্ছে। নিশ্চিন্দিপুর, আমার গ্রাম, সিনেমার বোড়াল গ্রাম। তফাৎ তো তেমন নেই। আমাদের গ্রামের কাছে শরতের সকালে কাশবনের ভেতর দিয়ে কয়লার ইঞ্জিনের ট্রেনের যাওয়া দেখা নেই। ওর বদলে আছে বেশ কিছুটা দূরে বড়ো সড়কের ওপর লম্বা লম্বা লরি। সেই কলেজের বন্ধুটিকে ফোন করলাম। শুধু এটুকুই বললাম, "তোর মতো আমারও দিদি ছিল জানিস তো?" সে ব্যঙ্গের হাসি হাসল। সে এখন ভালো চাকরি করে। কলকাতা থেকে ফোনে ভেসে আসা ওর হাসিতে কেমন যেন একটা অহংকার ঝরে পড়তে লাগল।
ফোনটা অবহেলায় পালঙ্কে আলতো করে ছুঁড়ে দিই। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি উত্তরের জানালাটার দিকে। সেখান থেকে ঘন সবুজের ভেতর পদ্মপুকুরটা এখনো দেখা যায়। ল্যাপটপে ইন্টারনেট খুলে নিছক কৌতুহলবশত খুঁজে যেতে থাকি পথের পাঁচালীর চলচ্চিত্রায়নের নির্মাণকথা। খুঁজে পাই বোড়াল গ্রাম। চুনীবালা দেবী, তুলসী চক্রবর্তী ইত্যাদি ইত্যাদি। চোখের সামনে ঈশ্বরের মতো দাঁড়ায় শালপ্রাংশু সত্যজিৎ রায়। আমি থাকতে পারি না। উমা দাশগুপ্তের মুখের সঙ্গে বুড়ির মুখটা মেলানোর চেষ্টা করি। মেলানোর চেষ্টা করি করুণার সঙ্গে মায়ের মুখটাও। মেলে না। মায়ের অধিকাংশ সাদা চুলের মাঝখানে রক্ত নদীর মতো সিঁদুর টকটক করে। আজ বড়োই অভিজ্ঞ লাগে মাকে।
আমি বিছানায় থাকতে পারিনা। নিজেকে অপুর জায়গায় সেই কবে কিশোরকাল থেকে বসাতে বসাতে মাঝে মাঝেই হ্যালুসিনেশন হতে থাকে। ল্যাপটপটা ফট করে বন্ধ করেই ঘর পিছনে ফেলে, উত্তরের জানালা ফেলে দ্রুত এসে দাঁড়াই ছোট্ট পুকুরটির কাছে। তার দক্ষিণ পূর্ব কোণের অশ্বত্থ গাছটির ছায়া তখন জলে পড়ছে না। বরং বিলম্বিত বিকেলের আলতো কমলা মেঘরঙ জলে পড়ছে। পদ্মপাতায় পড়ছে। পোকারা পা ছড়িয়ে ইতস্ততঃ খেলা করছে নিস্তরঙ্গ জলের ওপর। বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠল। পোকাদেরও ঘরবাড়ি আছে। পাতাদেরও সংসার আছে। শুধু আমারই একা বুড়ি নেই।
আষাঢ়ের এই প্রথম বিকেলে হঠাৎ মেঘ কালো হয়ে এলো। একটু পরেই ঝড়ো হাওয়া। সঙ্গে বৃষ্টি। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির ছাঁটে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকলাম একা...। হাওয়া আর ওড়াতে পারছে না ভেজা পাঞ্জাবির আঁচল। সন্ধে হয়ে এলো। কালো হতে থাকা জলে মিলিয়ে যেতে থাকল পোকাদের অস্থিরতা। হঠাৎ ওইপাড়ে দীর্ঘকায় একজনকে হেঁটে যেতে দেখে চেঁচিয়ে উঠলাম, "মানিকবাবু...বৃষ্টিতে বাঁশবাগান ভিজল। পদ্মপাতা ভিজল। আমিও ভিজলাম। আমি কিন্তু অপু হতে পারলাম না মানিকবাবু।" বলতে বলতেই আষাঢ় সন্ধ্যার অন্ধকারে দীর্ঘদেহী লোকটির দিকে এগিয়ে যেতে থাকলাম। লোকটি ততই আমার থেকে দূরে সরে যেতে থাকল। শুধু বৃষ্টি পরবর্তী ঝড়ো হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে গেল, "আমি কিন্তু অপু হতে পারলাম না মানিকবাবু...আমি কিন্তু বুড়ির ভাই হতে পারলাম না...।"

No comments:
Post a Comment